ইমরান খানকে ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ, উল্টো বিপদে পাকিস্তান
- আপডেট সময় : ০৩:১৯:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬৩ বার পড়া হয়েছে
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থকদের বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। তার রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করা হয়েছে। তবে সরকারের এই পদক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা জারির পর প্রদেশটির বিভিন্ন এলাকায় স্কুল বন্ধ, আংশিকভাবে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পণ্যবাহী কনটেইনার দিয়ে অবরোধ তৈরি করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও দেখা গেছে। যদিও পরবর্তী সময়ে পেশোয়ারসহ প্রদেশের বেশির ভাগ এলাকায় স্কুল খুলেছে এবং ইন্টারনেট সেবা চালু হয়েছে।
কেন জরুরি অবস্থা জারি করল পাকিস্তান সরকার?
পাকিস্তান সরকারের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী নেওয়া এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দেশটির কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার অভিযোগ করেছেন, পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মিলে কাজ করছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য বা প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার যুক্তির আড়ালে বিরোধী দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা থাকতে পারে। সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরিফা নূরের মতে, জরুরি অবস্থা জারির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক স্পষ্ট নয়। বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি প্রাদেশিক সরকারকে কেন্দ্রীয় সরকার আর সামলাতে চাইছে না—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ
গত এক সপ্তাহ ধরে খাইবার পাখতুনখাওয়ার বিভিন্ন এলাকায় ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে হাজার হাজার সমর্থক মিছিল ও বিক্ষোভ করেছেন। প্রদেশটিতে প্রায় ১৩ বছর ধরে পিটিআইয়ের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি।
তবে সোহেল আফ্রিদি বর্তমানে কোথায় আছেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। পিটিআইয়ের দাবি, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিপরীতে, সরকারের বক্তব্য, তাকে নিরাপত্তামূলক হেফাজতে রাখা হয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার খাইবার জেলার বারায় পিটিআইয়ের কয়েক ডজন সমর্থক রাস্তায় নামলে সেখানে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপের খবর পাওয়া যায়।
বিক্ষোভ দমনে ধরপাকড় চলার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। পিটিআইয়ের একাধিক নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ইমরান খানের তিন বোনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সমর্থকদের সংগঠিত করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছিল।
কারাগারে ইমরান, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি রয়েছেন ইমরান খান। দুর্নীতির একাধিক মামলায় তার সাজা হয়েছে। তবে এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন তিনি ও তার দল।
গত এক বছরে পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গে ইমরানের সাক্ষাতের সুযোগ সীমিত ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তার স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত আগস্টে তার দুই বোন তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় পিটিআইয়ের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে। তার ধারণা, দলটিকে কঠোর বার্তা দেওয়া এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা কঠিন করে তোলার উদ্দেশ্যেও সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব দীর্ঘদিনের। ইমরান খান সম্পর্কে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের জেরেই তিনি ক্ষমতা হারিয়েছেন। যদিও পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হোসেনের মতে, দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য সামরিক নেতৃত্বের দিকে চলে গেছে। অন্যদিকে, চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক ফারজানা শেখ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভূমিকার কারণে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে পারে।
তবে এসব বিশ্লেষণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন। জরুরি অবস্থা জারির পেছনে সামরিক নেতৃত্বের নির্দিষ্ট ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রমাণ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়নি।
একাধিক সংকটের মুখে পাকিস্তান
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি পাকিস্তানকে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দেশটিতে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে পাকিস্তান একাধিকবার আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধও রয়েছে। সামান্য উসকানিতে দুই দেশের উত্তেজনা আবার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে খাইবার পাখতুনখাওয়ার নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নতুন দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে পারে। আগে প্রাদেশিক সরকারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন সেখানে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা বাড়বে।
কঠোর পদক্ষেপে কি বাড়বে অস্থিতিশীলতা?
মাইকেল কুগেলম্যান সতর্ক করেছেন, জরুরি অবস্থা জারি ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। তার মতে, এতে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও বাড়লে সরকারকে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।
জাহিদ হোসেনও মনে করেন, একাধিক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা পাকিস্তানের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে দেশের অন্য এলাকাতেও একই ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষক আরিফা নূরের মতে, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পিটিআইয়ের পক্ষেও শুধু বিক্ষোভের মাধ্যমে ইমরান খানকে মুক্ত করা কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
পাকিস্তানের ইতিহাসে নির্বাচিত সরকার সরিয়ে দেওয়ার একাধিক নজির রয়েছে। অতীতে এসব পদক্ষেপের কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাই বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইমরান খান ও পিটিআইকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর করতে পারে।


























