মতিঝিল-কমলাপুরে এসএ পরিবহনের জমি জবরদখল করেছে রাজউক
- আপডেট সময় : ০৫:৪৬:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৭৯ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল-কমলাপুরে এসএ পরিবহনের জমি জবরদখল করেছে রাজউক। অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে রাজউকের কিছু কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে তারা আদালতের বিচারাধীন বিষয়কে পাশ কাটিয়ে গায়ের জোরে জমিটি দখল করেন।
কাগজে-কলমে যে জমি এসএ পরিবহনের, তা রাতারাতি সরকারি প্রকল্পের অংশ বানিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু নেপথ্যে কার স্বার্থে এই অপব্যবহার চলছে? রাজউক কি আসলেই আইন মানছে? নাকি কোনো কুচক্রী মহলের ইশারায় দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ নষ্ট করা হচ্ছে?
এসএ পরিবহনের জমি নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র
দীর্ঘ ৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে এসএ পরিবহন পার্সেল কুরিয়ার সেবা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের সেবার গতি বাড়াতে তারা মতিঝিল-কমলাপুরে ৫১.৫৩ শতাংশ জমি কেনে। সেখানে তারা একটি আধুনিক ডিপো তৈরি করেছিল। তবে এখন এই জমি নিয়ে গভীর ষড়যন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজউকের কিছু কর্মকর্তা আদালতের স্থগিতাদেশ পাশ কাটিয়ে জমিটি দখল করেছেন।
নিয়ম মেনে খাজনা-খারিজ প্রদান
সিএস রেকর্ড অনুযায়ী এই এলাকার মোট জমির পরিমাণ ৯.৭৬ একর। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অংশ থেকে সরকার ১৯৮৫ সালে মাত্র ১.২৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে সেই জমি ঢাকা ব্যাংক ও কমিউনিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিজ দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে শতবছর ধরে মালিক থাকা পরিবারের কাছ থেকে বাকি জমি কেনে এসএ পরিবহন। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত খাজনা-খারিজ পরিশোধ করে আসছে।
নকশায় গরমিল রেখে বুলডোজার চালনা
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসএ পরিবহনের স্বত্বাধিকারী সালাহউদ্দিন আহমেদ নিয়ম মেনে জমিটি কিনেছেন। কিন্তু রাজউক যে দাগ নম্বর ও নকশার কথা বলছে, তার সাথে এই জমির কোনো মিল নেই। প্রকৃতপক্ষে, রাজউকের নির্ধারিত জায়গাটি কোথায়—তার হদিস তারা করেনি। তা সত্ত্বেও রাজউক সরাসরি এসএ পরিবহনের কেনা জমিতে বুলডোজার চালিয়েছে।
আইনি জটিলতা ও আদালতের সিদ্ধান্ত
রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান যোগদানের পর নথিপত্র যাচাইয়ের নামে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা হয়। পরবর্তীতে মালিকানা নির্ধারণের জন্য জজ কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়।
মামলা চলাকালে রাজউক বারবার সময়ক্ষেপণ করছিল। তাই আদালত বাদীপক্ষকে হয়রানি না করতে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু পরবর্তীতে বর্তমান চেয়ারম্যান যোগদানের পর কৌশলগতভাবে হাইকোর্ট থেকে দ্রুত একটি স্থগিতাদেশ নেওয়া হয়। ফলে রাজউক গায়ের জোরে জমিটি দখলে নেয়।
“একটি প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বৈধ জমিতে এ ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ অভিযান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।”
— সালাহউদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান, এসএ গ্রুপ অব কোম্পানিজ।
রেলওয়ের জমিও বেআইনি দখলের চেষ্টা
শুধু এসএ পরিবহন নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের রেকর্ডভুক্ত জমিও দখলের চেষ্টা করছে রাজউক। এটি প্রচলিত ভূমি আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
কোনো আলোচনা ছাড়াই রেলওয়ের জমি দখলের এই চেষ্টা সরকারকে বিব্রত করছে। মূলত কোন ক্ষমতাবলে রাজউক এমন কাজ করছে, তা জানতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছে। তবে রাজউক চেয়ারম্যান এতে কোনো সাড়া দেননি।
রাজউক কি নিজেদের ভুল ঢাকছে?
প্রশ্ন থেকেই যায়, রাজউক কি নিজেদের নথিপত্রের ভুল ঢাকতে অন্যের জমি গ্রাস করছে? নাকি এর পেছনে প্রভাবশালী কোনো মহলের হাত রয়েছে? বিগত সরকারের নেওয়া এই বিতর্কিত প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছেন। তবে রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম রিজু দাবি করেন, তারা আইন অনুযায়ী কাজ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আইনি বিশ্লেষণ
ভূমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জমি অধিগ্রহণ করতে হয়। তবে দাগ নম্বর বা নকশায় গরমিল রেখে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
-
মহসীন রশিদ (সিনিয়র আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট): রাজউকের মূল প্লটের সঠিক সীমানা নির্ধারণ না করে উচ্ছেদ করা ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া কিছুই নয়।
-
নুর খান লিটন (মানবাধিকার কর্মী): আইনি আইনি তোয়াক্কা না করে কোনো সরকারি সংস্থার উচ্ছেদ অভিযান দেশের বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নথি ও দলিলের হিসাব অনুযায়ী, এসএ পরিবহনের জমির বড় অংশই মূল অধিগ্রহণের বাইরে রয়েছে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় সংস্থার নাম ভাঙিয়ে কিছু কর্মকর্তার এই খামখেয়ালীপনা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।




















