গাড়ি সুবিধা থেকে শ্যালকের চাকরি পুনর্বহাল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তার যত কাণ্ড
- আপডেট সময় : ০২:৫৩:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
- / ১৫৭৯ বার পড়া হয়েছে
স্বামী বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক। স্ত্রী চাকরি করেন একীভূত হতে যাওয়া দুর্দশাগ্রস্ত এক্সিম ব্যাংকে। স্ত্রীর পদবী সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। পদ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে কোনো গাড়ি প্রাপ্য নন। তবে স্বামীর দাপটে পেয়েছেন নিজের জন্য একটি গাড়ি। গাড়িটি স্ত্রীর নিজের ব্যাংক থেকে নয়। গাড়িটি দেওয়া হয়েছে একীভূত হতে যাওয়া অন্য আরেকটি ব্যাংক সোশ্যাল ইসলামী হতে।
এমনই ঘটনা ঘটিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম। যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজ্যুলেশন ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। তার অধীনেই রয়েছে একীভূত হতে যাওয়া ৫ ব্যাংকের কার্যক্রম।
স্ত্রীকে শুধু গাড়ি দিয়েই ক্ষান্ত হননি এই কর্মকর্তা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) হতে চাকরিচ্যুত শ্যালককে ফিরিয়ে দিয়েছেন তার চাকরি। নিজের আয়েশি জীবনের জন্য তাঁর রয়েছে তিনটি গাড়ি। পাশাপাশি ছেলেকে কানাডায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান তিনি। শুধু তাই নয় অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সময় থেকে বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও তার প্রভাব ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
এর আগে একসঙ্গে ২৪ জনকে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে চাকরিচ্যুত করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নির্বাহী পরিচালকের শ্যালক এসআইবিএলের অ্যাসিস্ট্যান্ট্ ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন অব: জুবায়ের মাহমুদের চাকরি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় ব্যাংক। শ্যালকের বিশেষ পরিচিত হওয়ায় এ সুবর্ণ সুযোগ পান আরেক কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিন যিনি ব্যাংকটিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেমের ভাগ্নিকে বিয়ে করায় রফিকুল ইসলামের নাম হয় জামাই রফিক। এই নামের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন তিনি। তার স্ত্রী এক্সিম ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারজানা কাবেরি। ব্যাংকটির মতিঝিল শাখার জেনারেল ব্যাংকিং ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বরত এই কর্মকর্তাকে গাড়ি সুবিধা প্রদান করে অপর ব্যাংক এসআইবিএল। যা পুরো ব্যাংকিং সেক্টরে নতুন ঘটনা।
তবে এসআইবিএল কর্তৃপক্ষ বলছে, গাড়ির সুবিধা জোর করে আদায় করেছেন রফিকুল ইসলাম। ব্যাংক রেজ্যুলেশন ডিপার্টমেন্টের (বিআরডি) নির্বাহী পরিচালক হওয়ায় এসআইবিএলকে বাধ্য করেছেন তার স্ত্রীকে একটি গাড়ি দিতে।
এদিকে রফিকুল ইসলাম নিজে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। তখন এসআইবিএল থেকে গাড়ির সুবিধা নেন। পরিবহণ পুল থেকে তাকে গাড়ি সুবিধা দেওয়া হয়। সে গাড়ির সুবিধা ভোগ করেন তার স্ত্রী ফারজানা কাবেরি। যখন গাড়ির প্রয়োজন হতো এসআইবিএলের পরিবহণ পুল থেকে গাড়ি বরাদ্দ দেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। যখন যে গাড়ি পাওয়া যেত সে গাড়িটিই স্ত্রীর প্রয়োজনে পাঠানো হতো বলে জানিয়েছেন এসআইবিএলের এক কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুখ খুলতে রাজি হননি এসআইবিএলের কেউ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইডি (নির্বাহী পরিচালক) স্যার একটি গাড়ি চাচ্ছিলেন। আমাদের নিয়মের মধ্যে গাড়ি প্রদানের বিষয়টি পড়ে না বলে আমরা জানিয়েছিলাম। কিন্তু স্যারের অব্যাহত প্রেশারে আমাদের প্রশাসক মহোদয় একটি গাড়ির ব্যবস্থা করেন। সে গাড়িটি স্যারের স্ত্রী ফারজানা ম্যাম ব্যবহার করতেন।’
ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, গত বছর ২০২৫ সালের আগস্ট মাসের ২৫ তারিখে এসআইবিএলের মানবসম্পদ (এইচ আর) প্রধান শাহরিয়ার খান কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে একযোগে ২৪ জনকে চাকরিচ্যুত করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এই ২৪ জনের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ২০ বছরের অধিক চাকরির অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। কোনো পূর্ব বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয় এমন সময়ে যখন ব্যাংকটিকে অন্য আরো চারটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া চলছিল।
পরবর্তীতে ব্যাংকটির এইচ আর হেড শাহরিয়ার খান চাকরিচ্যুত হওয়া সকল কর্মকর্তাকে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বরাবর আবেদন করতে বলেন। এ নির্দেশনায় চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেন। আবেদন করা সকল কর্মকর্তাদের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৮ তারিখ সকালে এসআইবিএল হেড অফিসে ডাকে কর্তৃপক্ষ। সেখানে তৎকালীন এমডি শাফিউজ্জামান ২৪ জন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করাকে ‘পচা ও বাজে’ কাজ বলে অভিহিত করেন। যেসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক অনিয়ম নেই তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হবে বলেও জানান এমডি। কিন্তু এরই মধ্যে রফিকুল ইসলামের শ্যালক ক্যাপ্টেন জুবায়েরকে সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে এবং জহির উদ্দিনকে অক্টোবরের ২৬ তারিখে তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ চাকরিচ্যুত বাকি ২২ জনকে আর চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এসআইবিএলের প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে। তবে তিনি ফোন ধরেননি। তার ব্যক্তিগত নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও তার কোনো উত্তর দেননি তিনি। তাই তার বক্তব্য জানা যায়নি। ব্যাংকের অন্য কোনো কর্মকর্তাও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এক্সিম ব্যাংকের এসভিপি ও রফিকুল ইসলামের স্ত্রী ফারজানা কাবেরি গাড়ি ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী যখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি ছিলেন তখন গাড়ি পেয়েছিলেন। সে গাড়ি আমরা ব্যবহার করতাম। এরচেয়ে বেশি কিছু জানতে হলে আমার হাজবেন্ডকে ফোন দেন।’
গাড়ি রিকুইজিশন নেওয়া ও শ্যালকের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে ফোন করা হয় রফিকুল ইসলামকে। তিনি বলেন, ‘আমি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডির চলতি দায়িত্বে ছিলাম। তখন আমাদের আরেকজন কর্মকর্তা নাজিমউদ্দিনও কোম্পানি সেক্রেটারি হিসেবে ছিলেন। আমাদের আসা যাওয়ার জন্য এসআইবিএল থেকে একটি ছোটো গাড়ি দেওয়া হয়। কারণ তখন বিভিন্ন ব্র্যাঞ্চে আমাদের আসা যাওয়া করতে গাড়িটি ব্যবহার করা হয়। আমার স্ত্রীর অফিসও মতিঝিলে। তাই মাঝেমধ্যে একসাথে বাসায় যেতাম। এছাড়া আর কোনো কাজে আমার স্ত্রী গাড়ি ব্যবহার করেননি। আর শ্যালকের চাকরি ফেরতের বিষয়ে আমার কোনো তদবির বা সুপারিশ ছিল না। সবকিছুই করেছিল ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ। আমিই বরং সালাহ উদ্দিন সাহেবকে (প্রশাসক) বলেছিলাম, এই কাজটা ঠিক হলো না। বাকিদেরকেও পুনর্বহাল করুন। পরবর্তী বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। কিন্তু এখনো পেন্ডিং রয়েছে সিদ্ধান্ত।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসাইন খান বলেন, ‘এক ব্যাংকের গাড়ি আরেক ব্যাংকের কর্মকর্তা ব্যবহার করতে পারেন না। এইটা যেভাবেই হোক, কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। যদি কেউ করে থাকে তবে তা অন্যায় করেছে। কিন্তু যদি কেউ ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে গাড়ি ব্যবহার করতে দেয় তবে সেইটাতো কোনো অন্যায় নয়।’
রফিকুল ইসলামের শ্যালকসহ দুইজনের চাকরি পুনর্বহালের বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফ হোসাইন খান বলেন, এ বিষয়ে একটি অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়েছে। এই অভিযোগের তদন্ত হবে, তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: এনপিবি নিউজ






















