০৭:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

ক্যাডার-নন-ক্যাডার দ্বন্দ্বে অস্থির জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৪:১১:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৬৪৪ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ক্রমেই জটিল হচ্ছে। নিয়োগ, ক্যাডারভুক্তি, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ এবং পদোন্নতি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। বিশেষ করে প্রকল্প ও নন-ক্যাডার থেকে আসা ৯০ জন কর্মকর্তার ক্যাডারভুক্তি এবং ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে। এ বিরোধের প্রভাব পড়ছে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও কর্মকর্তাদের পেশাগত পরিবেশে।

নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। দেশের গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বিরোধে এখন প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০১৯ সালের প্রজ্ঞাপন ঘিরে বিরোধের সূত্রপাত

অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ২০১৯ সালের একটি প্রজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে। ওই বছরের জানুয়ারিতে ৯৫ জন কর্মকর্তাকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) স্থানীয় সরকার বিভাগকে একটি চিঠি দেয়। সেখানে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্যাডারভুক্তির সুপারিশসংক্রান্ত কোনো রেকর্ড কমিশনে পাওয়া যায়নি।

এর আগে ২০১২ সালে বিধিমালা ও শূন্যপদের অভাবে পিএসসির সুপারিশ পাওয়া ৩২ জন নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করার সুযোগ নাকচ করা হয়েছিল। ফলে একই প্রতিষ্ঠানে একদল কর্মকর্তার ক্যাডারভুক্তি প্রত্যাখ্যান এবং অন্যদের ক্যাডারভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অন্যদিকে, ২০১৯ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ১৯৫টি নতুন ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব পদ সৃষ্টির প্রজ্ঞাপনে পেছনের তারিখ থেকে কার্যকারিতা দেওয়ার কোনো নির্দেশনা ছিল না।

৯০ কর্মকর্তার ভূতাপেক্ষ ক্যাডারভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন

বিরোধের নতুন মাত্রা যোগ হয় ২০২২ সালের ১৫ জুন। ওই দিন ৯০ জন কর্মকর্তাকে রাজস্ব খাতে যোগদানের আগের তারিখ থেকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়।

বিসিএস কর্মকর্তাদের দাবি, স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০১২ সালের ৮ অক্টোবরের একটি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট সময়ে এসব পদের অস্তিত্ব না থাকার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তাদের প্রশ্ন, যে সময়ে ক্যাডার পদই ছিল না, সেই সময় থেকে কীভাবে কর্মকর্তাদের ক্যাডারভুক্তির সুবিধা দেওয়া হলো?

এ ছাড়া ক্যাডারভুক্তির আদেশ জারির পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে যোগদানপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

বিসিএস কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পিএসসি ও সরকারের প্রচলিত নিয়োগবিধি অনুসরণ না করেই ২০১৭ সালের আগের ৯০ জন প্রকল্প ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির তারিখেরও আগে থেকে তাদের ক্যাডারভুক্তির সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ

বর্তমানে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ক্যাডারভুক্ত হওয়া কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী চাকরিকাল জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গণনা করা হবে কি না, সেই প্রশ্ন।

২০২২ সালে অধিদপ্তরের ৬৩ জন কর্মকর্তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী পদোন্নতির আগে পূর্ণাঙ্গ জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির শর্ত রাখা হয়েছিল।

সরাসরি বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, পরবর্তী সময়ে ক্যাডারভুক্ত হওয়া কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির সুবিধা দেওয়ায় নিয়মিত বিসিএস কর্মকর্তারা পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিসিএস কর্মকর্তা বলেন, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী একজন নিয়মিত বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাকে নবম গ্রেড থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে (সিনিয়র স্কেল) পদোন্নতি পেতে কয়েকটি বাধ্যতামূলক ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

এর মধ্যে রয়েছে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষা এবং সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা। এসব শর্ত পূরণের পর আরও পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করলে একজন কর্মকর্তা পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতির যোগ্য হন।

তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে কিছু পদ সৃষ্টি করে ২০১৭ সালের আগের ৯০ জন প্রকল্প ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়। ২০২২ সালের আদেশে তাদের ক্যাডারভুক্তির তারিখও স্পষ্ট করা হয়নি।

ওই কর্মকর্তার দাবি, নিয়মিত বিসিএস কর্মকর্তারা ১০ বছর চাকরি করেও যেখানে নবম গ্রেডে আটকে রয়েছেন, সেখানে ক্যাডারভুক্তির মাত্র তিন মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ৪৫ জনকে সরাসরি পঞ্চম গ্রেডে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়।

উচ্চ আদালতে মামলা, তবু পদোন্নতির সুবিধা ভোগের অভিযোগ

ক্যাডারভুক্তি ও পদোন্নতির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন সংক্ষুব্ধ বিসিএস কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে দায়ের করা মামলাটি এখনো বিচারাধীন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পঞ্চম গ্রেডের সুবিধা ভোগ করছেন। এমনকি ষষ্ঠ গ্রেডের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ারও চেষ্টা করছেন তারা।

বিসিএস কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারি চাকরির নিয়োগ, পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এতে নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

বিধিগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞের

চাকরির বিধানাবলি বিষয়ক বইয়ের লেখক মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এ বিষয়ে বলেন, বিধিগতভাবে ক্যাডারভুক্তির মাত্র তিন মাসের মধ্যে কাউকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই।

তার দাবি, এভাবে তড়িঘড়ি করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করা জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ

এ বিরোধ নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে ২০২২ সালের ১৯ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করে বিসিএস পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনের সভাপতি বিলকিস আকতার ও সাধারণ সম্পাদক ইবনে মায়াজ প্রামাণিক স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে ৯০ জন কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করার প্রজ্ঞাপন সংশোধনের দাবি জানানো হয়।

আবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে ক্যাডার পদ সৃষ্টির আগেই অস্তিত্বহীন ক্যাডার পদে ৯০ জন সহকারী প্রকৌশলীকে ভূতাপেক্ষভাবে ক্যাডারভুক্ত করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রকৌশল জনস্বাস্থ্য) গঠন ও ক্যাডার বিধিমালা, ১৯৮০-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এ ছাড়া অধিদপ্তরের ক্যাডারভুক্ত পদের দুই-তৃতীয়াংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান রয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। সংগঠনটির দাবি, ৯০ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষভাবে ক্যাডারভুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের কোনো সুপারিশ ছিল না।

জ্যেষ্ঠতায় পিছিয়ে পড়ছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী জানান, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির তারিখেরও ১৮ বছর আগে থেকে ওই ৯০ জন কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্তির সুবিধা দেওয়ায় অধিদপ্তরের অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠতায় পিছিয়ে পড়েছেন।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে করছেন।

ফলে দীর্ঘদিনের চাকরির অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও পদোন্নতির প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। এতে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ ও হতাশা বাড়ছে।

সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ক্যাডার-নন-ক্যাডার বিরোধ এখন শুধু পদোন্নতি বা জ্যেষ্ঠতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি নিয়োগবিধির প্রয়োগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সরকারি চাকরির সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতের বিচারাধীন বিষয়টির নিষ্পত্তি এবং নিরপেক্ষভাবে জ্যেষ্ঠতা তালিকা পর্যালোচনা করা না হলে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ক্যাডার-নন-ক্যাডার দ্বন্দ্বে অস্থির জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

আপডেট সময় : ০৪:১১:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ক্রমেই জটিল হচ্ছে। নিয়োগ, ক্যাডারভুক্তি, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ এবং পদোন্নতি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। বিশেষ করে প্রকল্প ও নন-ক্যাডার থেকে আসা ৯০ জন কর্মকর্তার ক্যাডারভুক্তি এবং ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে। এ বিরোধের প্রভাব পড়ছে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও কর্মকর্তাদের পেশাগত পরিবেশে।

নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। দেশের গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বিরোধে এখন প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০১৯ সালের প্রজ্ঞাপন ঘিরে বিরোধের সূত্রপাত

অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ২০১৯ সালের একটি প্রজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে। ওই বছরের জানুয়ারিতে ৯৫ জন কর্মকর্তাকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) স্থানীয় সরকার বিভাগকে একটি চিঠি দেয়। সেখানে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্যাডারভুক্তির সুপারিশসংক্রান্ত কোনো রেকর্ড কমিশনে পাওয়া যায়নি।

এর আগে ২০১২ সালে বিধিমালা ও শূন্যপদের অভাবে পিএসসির সুপারিশ পাওয়া ৩২ জন নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করার সুযোগ নাকচ করা হয়েছিল। ফলে একই প্রতিষ্ঠানে একদল কর্মকর্তার ক্যাডারভুক্তি প্রত্যাখ্যান এবং অন্যদের ক্যাডারভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অন্যদিকে, ২০১৯ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ১৯৫টি নতুন ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব পদ সৃষ্টির প্রজ্ঞাপনে পেছনের তারিখ থেকে কার্যকারিতা দেওয়ার কোনো নির্দেশনা ছিল না।

৯০ কর্মকর্তার ভূতাপেক্ষ ক্যাডারভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন

বিরোধের নতুন মাত্রা যোগ হয় ২০২২ সালের ১৫ জুন। ওই দিন ৯০ জন কর্মকর্তাকে রাজস্ব খাতে যোগদানের আগের তারিখ থেকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়।

বিসিএস কর্মকর্তাদের দাবি, স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০১২ সালের ৮ অক্টোবরের একটি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট সময়ে এসব পদের অস্তিত্ব না থাকার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তাদের প্রশ্ন, যে সময়ে ক্যাডার পদই ছিল না, সেই সময় থেকে কীভাবে কর্মকর্তাদের ক্যাডারভুক্তির সুবিধা দেওয়া হলো?

এ ছাড়া ক্যাডারভুক্তির আদেশ জারির পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে যোগদানপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

বিসিএস কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পিএসসি ও সরকারের প্রচলিত নিয়োগবিধি অনুসরণ না করেই ২০১৭ সালের আগের ৯০ জন প্রকল্প ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির তারিখেরও আগে থেকে তাদের ক্যাডারভুক্তির সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ

বর্তমানে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ক্যাডারভুক্ত হওয়া কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী চাকরিকাল জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গণনা করা হবে কি না, সেই প্রশ্ন।

২০২২ সালে অধিদপ্তরের ৬৩ জন কর্মকর্তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী পদোন্নতির আগে পূর্ণাঙ্গ জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির শর্ত রাখা হয়েছিল।

সরাসরি বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, পরবর্তী সময়ে ক্যাডারভুক্ত হওয়া কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির সুবিধা দেওয়ায় নিয়মিত বিসিএস কর্মকর্তারা পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিসিএস কর্মকর্তা বলেন, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী একজন নিয়মিত বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাকে নবম গ্রেড থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে (সিনিয়র স্কেল) পদোন্নতি পেতে কয়েকটি বাধ্যতামূলক ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

এর মধ্যে রয়েছে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষা এবং সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা। এসব শর্ত পূরণের পর আরও পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করলে একজন কর্মকর্তা পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতির যোগ্য হন।

তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে কিছু পদ সৃষ্টি করে ২০১৭ সালের আগের ৯০ জন প্রকল্প ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়। ২০২২ সালের আদেশে তাদের ক্যাডারভুক্তির তারিখও স্পষ্ট করা হয়নি।

ওই কর্মকর্তার দাবি, নিয়মিত বিসিএস কর্মকর্তারা ১০ বছর চাকরি করেও যেখানে নবম গ্রেডে আটকে রয়েছেন, সেখানে ক্যাডারভুক্তির মাত্র তিন মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ৪৫ জনকে সরাসরি পঞ্চম গ্রেডে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়।

উচ্চ আদালতে মামলা, তবু পদোন্নতির সুবিধা ভোগের অভিযোগ

ক্যাডারভুক্তি ও পদোন্নতির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন সংক্ষুব্ধ বিসিএস কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে দায়ের করা মামলাটি এখনো বিচারাধীন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পঞ্চম গ্রেডের সুবিধা ভোগ করছেন। এমনকি ষষ্ঠ গ্রেডের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ারও চেষ্টা করছেন তারা।

বিসিএস কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারি চাকরির নিয়োগ, পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এতে নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

বিধিগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞের

চাকরির বিধানাবলি বিষয়ক বইয়ের লেখক মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এ বিষয়ে বলেন, বিধিগতভাবে ক্যাডারভুক্তির মাত্র তিন মাসের মধ্যে কাউকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই।

তার দাবি, এভাবে তড়িঘড়ি করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করা জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ

এ বিরোধ নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে ২০২২ সালের ১৯ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করে বিসিএস পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনের সভাপতি বিলকিস আকতার ও সাধারণ সম্পাদক ইবনে মায়াজ প্রামাণিক স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে ৯০ জন কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করার প্রজ্ঞাপন সংশোধনের দাবি জানানো হয়।

আবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে ক্যাডার পদ সৃষ্টির আগেই অস্তিত্বহীন ক্যাডার পদে ৯০ জন সহকারী প্রকৌশলীকে ভূতাপেক্ষভাবে ক্যাডারভুক্ত করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রকৌশল জনস্বাস্থ্য) গঠন ও ক্যাডার বিধিমালা, ১৯৮০-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এ ছাড়া অধিদপ্তরের ক্যাডারভুক্ত পদের দুই-তৃতীয়াংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান রয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। সংগঠনটির দাবি, ৯০ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষভাবে ক্যাডারভুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের কোনো সুপারিশ ছিল না।

জ্যেষ্ঠতায় পিছিয়ে পড়ছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী জানান, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির তারিখেরও ১৮ বছর আগে থেকে ওই ৯০ জন কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্তির সুবিধা দেওয়ায় অধিদপ্তরের অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠতায় পিছিয়ে পড়েছেন।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে করছেন।

ফলে দীর্ঘদিনের চাকরির অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও পদোন্নতির প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। এতে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ ও হতাশা বাড়ছে।

সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ক্যাডার-নন-ক্যাডার বিরোধ এখন শুধু পদোন্নতি বা জ্যেষ্ঠতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি নিয়োগবিধির প্রয়োগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সরকারি চাকরির সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতের বিচারাধীন বিষয়টির নিষ্পত্তি এবং নিরপেক্ষভাবে জ্যেষ্ঠতা তালিকা পর্যালোচনা করা না হলে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।