লুটপাট-বিক্ষোভে বিপর্যস্ত ফ্রান্স, যা বললেন মাখোঁ
- আপডেট সময় : ০৩:২৪:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪৫ বার পড়া হয়েছে
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের সংকট, বেকারত্ব ও সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন কয়েকটি শহরে সহিংস রূপ নিয়েছে। কোথাও দোকানপাটে লুটপাট, কোথাও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাঁদানে গ্যাসসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের কথা স্বীকার করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তবে তাঁর বক্তব্যে সংকট সমাধানে সুনির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ফ্রান্সের অস্থিরতার জন্য দেশটির অভিবাসননীতিকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ফ্রান্সের বিক্ষোভ নিয়ে রসিকতা করেছেন।
ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, প্যারিসে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অধিকাংশ স্থানে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে রাতের দিকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
প্যারিসে মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দোকানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেন। লিওঁ শহরে পর্যটন দপ্তরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে আগুনের কারণে ১৪৩ বছরের পুরোনো সিটি হলের চূড়া ধসে পড়ে।
রোববার বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমলেও বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা অব্যাহত ছিল। রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। সপ্তাহান্তের শেষে শহরের পরিস্থিতিকে যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে তুলনা করেন সেখানে আসা এক দর্শনার্থী।
শিক্ষা খাতের সংকট থেকে আন্দোলনের বিস্তার
ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় সেপ্টেম্বরে। প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের দাবিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা ধর্মঘট শুরু করেন। কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক দাবিগুলো মেনে নিলেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। বরং ধীরে ধীরে তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং শিক্ষা উপকরণের অভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে।
শনিবার প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে ৫৭ বছর বয়সী ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য মারিয়া পালাস বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও বেকারত্বসহ নানা সমস্যায় মানুষ ক্ষুব্ধ। তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তাঁরা প্রত্যাশিত সুযোগ পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্যারিসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী পাওলা ফোরমেন্তিও বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভকে ন্যায্য বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি সহিংসতার বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, মানুষের অভিযোগের জবাব দেওয়া এবং তাদের কথা শোনা গেলে সহিংসতা এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিক্ষোভ নিয়ে মাখোঁর বক্তব্য
রোববারের ভাষণে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ও অসন্তোষের বিষয়টি স্বীকার করেন। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম মোকাবিলা এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে কয়েকটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
তবে এসব উদ্যোগের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দেননি ফরাসি প্রেসিডেন্ট। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা খাতের সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ কতটা কমবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের মন্তব্য
ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের দুই শীর্ষ নেতা মন্তব্য করেছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিমোজ শহরের সিটি হলে আগুনের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি ফ্রান্সের অস্থিরতার জন্য দেশটির ব্যর্থ অভিবাসননীতিকে দায়ী করেন।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জর্জিয়ায় এক সমাবেশে ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রসঙ্গ তোলেন। রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে পাঁচ হাজার ডলার লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি রসিকতা করে বলেন, “চলুন ফ্রান্সে যাই, বিপ্লবে যোগ দিই এবং সেখানে আমাদের ৫ হাজার ডলার খরচ করি।”
ইউরোপের অন্য দেশেও অস্থিরতা
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশেও বিক্ষোভ ও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে শনিবার কয়েক হাজার মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে মিছিল করেন।
ইতালির মিলানে টানা দুই রাত অস্থিরতা চলে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের পাথর নিক্ষেপ ও সুপারমার্কেটে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
এ ছাড়া আলবেনিয়ায় কথিত সরকারি দুর্নীতির প্রতিবাদে কয়েক মাস ধরে বিক্ষোভ চলছে। সপ্তাহান্তে রাজধানী তিরানায় আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
আগামী নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে
ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভ আগামী বসন্তে অনুষ্ঠেয় দেশটির নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন দাবি করেছেন, ন্যায্য সামাজিক অসন্তোষকে আবারও কট্টর বামপন্থীরা জিম্মি করেছে।
অন্যদিকে, কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশো শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করার অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের নজর এখন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। জীবনযাত্রার ব্যয়, বেকারত্ব ও শিক্ষা খাতের সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ফরাসি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।






















