ময়মনসিংহে নির্মাণ হচ্ছে দুই সেতু, বদলে যাবে যোগাযোগব্যবস্থা
- আপডেট সময় : ০৪:১৬:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৮৫ বার পড়া হয়েছে
যানজট নিরসন ও যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। এর মধ্যে কেওয়াটখালীতে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবার সেতুর আদলে নির্মিত হচ্ছে পিলারবিহীন স্টিল আর্চ সেতু। অন্যদিকে রহমতপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে কংক্রিট ও স্টিল আর্চের সমন্বয়ে আরেকটি সেতু।
সেতু দুটি নির্মাণ শেষ হলে ময়মনসিংহের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি শেরপুর, নেত্রকোণা, জামালপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকা ও স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়বে।
সিডনি হারবারের আদলে কেওয়াটখালী সেতু
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাইপাস মোড় থেকে চায়না মোড় পর্যন্ত প্রায় ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে কেওয়াটখালীতে নির্মাণ করা হচ্ছে স্টিল আর্চ সেতু। মূল সেতুটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১০০ মিটার।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সেতুটির সঙ্গে থাকবে ছয় লেনের যোগাযোগব্যবস্থা। এর মধ্যে চারটি লেন ভারী যানবাহনের জন্য এবং দুটি লেন মোটরসাইকেল ও হালকা যানবাহনের জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পে ২৫০ মিটার দীর্ঘ রেলওয়ে ওভারপাস, টোল প্লাজা, বিশ্রামাগার, ওয়াচ টাওয়ার ও দৃষ্টিনন্দন পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সওজের কেওয়াটখালী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. দিদারুল আলম জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ময়মনসিংহ নগরীর ব্রীজের মোড় এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট অনেকাংশে কমবে। পাশাপাশি নেত্রকোণা, শেরপুর, জামালপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ সহজ হবে।
নির্মাণকাজে ভূমি ও ইউটিলিটি জটিলতা
প্রকল্পের শুরু থেকেই ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর ও নকশাসংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি, গ্যাসলাইনসহ বিভিন্ন সেবা সংযোগ স্থানান্তরেও সময় লেগেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, নির্ধারিত সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো কর্মস্থল বুঝিয়ে দিতে না পারায় নির্মাণকাজের গতি কিছুটা কমেছে। এসব কারণে ঋণচুক্তির মেয়াদ ও প্রকল্পের সমাপ্তিকাল বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
তবে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, কেউ জমির মূল্য পেলেও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। আবার ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতেও ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত।
রহমতপুরে দ্বিতীয় ব্রহ্মপুত্র সেতু
শেরপুরের সঙ্গে ময়মনসিংহ ও ঢাকার যোগাযোগের দূরত্ব কমাতে রহমতপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে আরেকটি সেতু। কংক্রিট ও স্টিল আর্চের সমন্বয়ে নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৭২ মিটার। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
শেরপুর (কানাসাখোলা)-ভীমগঞ্জ-নারায়ণখোলা-রামভদ্রপুর-পরানগঞ্জ-ময়মনসিংহ (রহমতপুর) সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শেরপুরের সঙ্গে ময়মনসিংহ ও রাজধানীর সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার কমবে।
একই সঙ্গে নাকুগাঁও স্থলবন্দর, কুড়িগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গেও যোগাযোগের দূরত্ব কমবে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পাট ও কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রহমতপুর সেতুর কাজ
প্রকল্পের ৪ নম্বর প্যাকেজের আওতায় ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতু নির্মাণের পাশাপাশি রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। মূল সেতুতে ৩৩০ মিটার স্টিল নেটওয়ার্ক স্ট্রাকচারের তিনটি স্প্যান এবং ২৩টি পিসি গার্ডার থাকবে।
এ ছাড়া ৭৮৫ মিটার এপ্রোচ সড়ক, আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল, স্ট্রিট লাইটিং, ফুটপাত, ড্রেন ও ইন্টারসেকশন নির্মাণ করা হবে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খ. মো. শরীফুল আলম জানান, রহমতপুর সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ২০২৭ সালের জুনে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা থাকলেও তা ইতোমধ্যে শেষ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সেতু ঘিরে আশায় চরাঞ্চলের মানুষ
ব্রহ্মপুত্রের ওপর দুটি সেতু নির্মাণের খবরে চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আশাবাদ। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতু না থাকায় নদী পারাপারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকার অপেক্ষায় থাকতে হয়। জরুরি রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়াও অনেক সময় সম্ভব হয় না।
শিক্ষার্থীদেরও নদী পার হয়ে স্কুল-কলেজে যেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ফলে ক্লাস ও পরীক্ষায় দেরি হওয়ার ঘটনা ঘটে।
ময়মনসিংহের চরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হলেও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষকরা অনেক সময় কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। সেতু নির্মাণ হলে কৃষকরা সরাসরি বাজারে পণ্য নিয়ে যেতে পারবেন বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সেতু দুটিকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
সংযোগ সড়কের নকশা নিয়ে প্রশ্ন
তবে কেওয়াটখালী স্টিল আর্চ সেতুর সংযোগ সড়কের নকশা ও সেতুর মুখ নামানোর স্থান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কয়েকজন নাগরিক নেতা।
সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেনের অভিযোগ, স্টিল আর্চ সেতুর সংযোগ সড়ক চায়না মোড়ে গিয়ে মিলবে। ফলে বর্তমানে ব্রীজের মোড় এলাকায় যে ধরনের যানজট রয়েছে, ভবিষ্যতে তা চায়না মোড় ও শম্ভুগঞ্জ এলাকায় তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, শুধু সেতু নির্মাণ করলেই যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে না। অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্রের ওপর নির্মাণাধীন দুই সেতুকে ঘিরে স্থানীয়দের প্রত্যাশা অনেক। নির্ধারিত সময় ও বরাদ্দের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করে দ্রুত এর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা ময়মনসিংহবাসীর।





















