ইরানকে প্রতিহত করতে ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে সৌদি আরব
- আপডেট সময় : ১২:৩৬:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬৬ বার পড়া হয়েছে
সৌদি আরব তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কমপ্লেক্সে নতুন স্থাপনা নির্মাণের তথ্য উঠে এসেছে বাণিজ্যিক উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে। এর মাধ্যমে আরও বড় আকারের সলিড-ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা। এসব ক্ষেপণাস্ত্র অধিক ওজনের বিস্ফোরক বা অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম বহন করে আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তির সহায়তা থাকার ইঙ্গিতও পেয়েছেন বিশ্লেষকেরা। খবর রয়টার্সের।
ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানায় সম্প্রসারণ
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এফপিআরআই) গবেষক স্যাম লেয়ার ও মাইকেল ডুইটম্যান এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিক উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামোর সম্প্রসারণের তথ্য তুলে ধরেছেন।
তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজধানী রিয়াদের প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত আল-দুওয়াদিমি কমপ্লেক্সে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্যাটেলাইট কোম্পানি প্ল্যানেট ল্যাবস ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব উপগ্রহ চিত্র সংগ্রহ করে।
উপগ্রহ চিত্রে একটি নতুন ভবন দেখা গেছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানি প্রস্তুত করার জন্য ব্যবহৃত কাস্টিং পিট বা ঢালাইয়ের গর্ত রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় জ্বালানির উপাদান মিশিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের মোটর কেসিংয়ের ভেতরে ঢেলে শক্ত করা হয়। এটি সলিড-ফুয়েল রকেট মোটর তৈরির গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।
গবেষকদের মতে, নতুন ভবনটি প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল দিয়ে ঘেরা। আকস্মিক বিস্ফোরণের ঝুঁকি কমানো এবং আশপাশের অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখার জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। ভবনটি কমপ্লেক্সের আগের কাস্টিং পিটযুক্ত ভবনের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ বড় বলে তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংরক্ষণের জন্য আরেকটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
ইরানকে মোকাবিলায় বাড়তে পারে সামরিক সক্ষমতা
বিশ্লেষকদের ধারণা, সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামোর এই সম্প্রসারণের লক্ষ্য হতে পারে আরও বড় ও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা। এসব ক্ষেপণাস্ত্র বেশি পেলোড বহনের পাশাপাশি দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে।
এর ফলে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা মোকাবিলায় সৌদি আরবের সামরিক বিকল্প বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটেও এ সক্ষমতা দেশটির সামরিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে নতুন স্থাপনা নির্মাণের তথ্য থেকে ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা হচ্ছে, সেগুলোর পাল্লা কত হবে কিংবা উৎপাদন কবে শুরু হবে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ বিষয়ে সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
চীনা প্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত
এফপিআরআইয়ের গবেষকদের পাশাপাশি লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এবং সিএনএ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীনা প্রযুক্তির সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছেন।
লেয়ার ও ডুইটম্যানের মতে, আল-দুওয়াদিমি কমপ্লেক্সের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানার মিল রয়েছে। সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর বিদ্যমান সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যও চীনের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
তবে উপগ্রহ চিত্রে স্থাপনার সাদৃশ্য পাওয়া মানেই যে চীন সরাসরি নতুন কারখানা নির্মাণ বা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সহায়তা করছে, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না।
চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সহযোগিতার ইতিহাস
সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীনের সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত সিআইএর একটি অবমুক্ত নথি অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে চীন থেকে প্রায় ৪০টি তরল জ্বালানিচালিত ডিএফ-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র গোপনে সংগ্রহ করেছিল সৌদি আরব।
পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের এপ্রিলে সৌদি আরবের একটি সামরিক কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো এ ধরনের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া এফপিআরআইয়ের গবেষকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে ইয়েমেনে সৌদি বাহিনীর ব্যবহৃত চীনা মডেলের ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করার দাবি করেছেন। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সৌদি আরব কঠিন জ্বালানিচালিত ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে থাকতে পারে।
তবে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করা এবং সৌদি আরবে ওই ক্ষেপণাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন চলছে—এ দুটি পৃথক বিষয়। উৎপাদনের মাত্রা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কেন চীনের দিকে ঝুঁকছে রিয়াদ?
বিশ্লেষকদের ধারণা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধ সৌদি আরবকে বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করেছে। এ ক্ষেত্রে চীন সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা এবং ইয়েমেনের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নতুন কারখানার সম্প্রসারণের প্রকৃত উদ্দেশ্য, চীনের সহায়তার পরিমাণ এবং সম্ভাব্য নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। আপাতত উপগ্রহ চিত্র ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাব্য উদ্যোগের দিকেই ইঙ্গিত করছে।




















