সড়ক দুর্ঘটনায় আহতকে হাসপাতালে নিলে উদ্ধারকারীর বিরুদ্ধে মামলা নয়
- আপডেট সময় : ০১:১৪:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৩২ বার পড়া হয়েছে
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মানবিক সহায়তাকারীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা করা যাবে না। এমনকি হাসপাতালে নেওয়ার পর আহত ব্যক্তির মৃত্যু হলেও শুধু উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার কারণে দায়ী করা যাবে না। সাধারণ মানুষকে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে উৎসাহিত করতে সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর খসড়ায় এমন আইনি সুরক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে ‘গুড সামারিটান’ বা মানবিক উদ্ধারকারীদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা কিংবা হাসপাতালে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি জটিলতার ভয় কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গুড সামারিটান সুরক্ষায় যা থাকছে
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সৎ উদ্দেশ্যে মানবিক বিবেচনায় দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করলে তার বিরুদ্ধে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি বা মৃত্যুর অভিযোগে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা করা যাবে না।
এমনকি উদ্ধারকারীর দেওয়া সহায়তার পর আহত ব্যক্তির মৃত্যু হলেও কেবল তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কারণে উদ্ধারকারীকে দায়ী করা যাবে না।
দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় প্রথম এক ঘণ্টাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি ও গুরুতর শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
কিন্তু পুলিশি ঝামেলা, মামলা কিংবা আদালতে সাক্ষী হিসেবে হাজির হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে চান না। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি দ্রুত উদ্ধার ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খসড়া আইনে।
৩০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রস্তাব
প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এ দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর জন্য কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ও অ্যাম্বুলেন্স টিম গঠনের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে উপযুক্ত হাসপাতালে স্থানান্তর এবং গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোকে আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, ‘দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ যেন আইনি জটিলতার ভয়ে পিছিয়ে না যায়, সে জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। তাই গুড সামারিটান সুরক্ষার প্রস্তাবটির মাধ্যমে উদ্ধারকারীকে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাহমিদুর রহমান বলেন, মানবিক কারণে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলে তা জনসাধারণকে উদ্ধারকাজে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে প্রকৃত মানবিক সহায়তা এবং ইচ্ছাকৃত ক্ষতি বা গুরুতর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে আইনে সুরক্ষার পরিধি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
বর্তমান আইনে কী বলা আছে
বর্তমানে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৬২ ধারায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া দেশব্যাপী টোল-ফ্রি টেলিফোন নম্বর চালুর কথা বলা হয়েছে। দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোটরযানের চালক, কন্ডাক্টর বা তাদের প্রতিনিধিকে নিকটস্থ থানায় দুর্ঘটনার খবর জানাতে হয়।
আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এই বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
অনিরাপদ সড়ক নির্মাণেও দায় নির্ধারণ
সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর খসড়ায় শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও চিকিৎসার বিষয় নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সড়কের নকশা, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে। ভুল নকশা কিংবা অনিরাপদ অবকাঠামোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তায় নতুন বিধান
প্রস্তাবিত আইনে পথচারীদের নিরাপত্তায় ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী উভয়ের জন্য হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের নিরাপদে মোটরযানে পরিবহনের জন্য বিধিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।
সাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তায় পৃথক লেন তৈরির প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের উপযোগী সড়ক ও গণপরিবহন নিশ্চিত করার বিষয়টি খসড়ায় রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর খসড়ায় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, দ্রুত উদ্ধার, জরুরি চিকিৎসা এবং মানবিক সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব প্রস্তাব কার্যকর হতে হলে আইনটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
সূত্র: বাসস




















