প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ৩০ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
- আপডেট সময় : ১২:৪৫:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫২৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়ন এবং শিশুদের শিখনদক্ষতা বাড়াতে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ অর্থায়নের মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা দেশের প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুর শিক্ষার মান উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নির্বাহী পরিচালকদের পর্ষদ এ অর্থায়নের অনুমোদন দেয়। ‘লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্সিলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন প্রোগ্রাম’ নামের এ কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শ্রেণি অনুযায়ী পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বাংলাদেশের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও সহায়তা করবে সংস্থাটি।
প্রাথমিক শিক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ শিখনদক্ষতার ঘাটতি
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মৌলিক পড়া ও গণিতের দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ বছর বয়সী প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু বয়সোপযোগী একটি সাধারণ লেখা পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না। তুলনামূলকভাবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ মালয়েশিয়ায় এ হার ৪২ শতাংশ এবং ব্রাজিলে ৪৭ শতাংশ।
শিক্ষার্থীদের এই শিখনঘাটতি দূর করতে নতুন কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় শিশুদের শ্রেণি ও বয়স অনুযায়ী শেখার সুযোগ তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে।
২ কোটি ৬০ লাখ শিশুর জন্য বিশেষ কর্মসূচি
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার দেশ। সরকারি বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও মাদরাসা মিলিয়ে ২ কোটির বেশি শিশু প্রাথমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করছে।
এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিখনদক্ষতা বাড়াতে কর্মসূচির আওতায় মৌলিক সাক্ষরতা ও গণনাদক্ষতা অর্জনের বিশেষ প্যাকেজ চালু করা হবে। এতে শিক্ষার্থীদের উপযোগী শিক্ষাসামগ্রী, সুনির্দিষ্ট পাঠ পরিকল্পনা এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
বিশেষ করে পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা কতটা আয়ত্ত করতে পারছে, সেদিকে নজর দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
৯০ শতাংশ প্রধান শিক্ষক পাবেন প্রশিক্ষণ
শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান উন্নয়ন নয়, বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার বিষয়টিও কর্মসূচিতে গুরুত্ব পেয়েছে।
এ লক্ষ্যে দেশের ৯০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষার পরিবেশ এবং পাঠদান ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। যাতে তাঁরা শ্রেণিকক্ষে আরও কার্যকরভাবে পাঠদান করতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে পারেন।
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় সক্ষম কর্মশক্তি গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি হলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা।
তিনি জানান, গত দুই দশকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ বাংলাদেশে প্রায় সব শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়া নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে। নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে শিশুদের আরও ভালোভাবে শেখার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে ভালো কর্মসংস্থান পাওয়ার ভিত্তিও শক্তিশালী হবে।
কর্মসূচিটির দলনেতা ও বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ তাশমিনা রহমান বলেন, উন্নত কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কোনো শিশু যেন শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে কর্মসূচিতে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলার শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে, সেসব জেলায় কার্যক্রম বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তাশমিনা রহমান জানান, শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দ করা বাজেটের জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার আরও জোরদার করা হবে।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নেও গুরুত্ব
শিশুদের শিক্ষাজীবনের শুরুটা শক্তিশালী করতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই শিশুদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রত্যাশা, নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ লাখ ৪৩ হাজার নতুন ও উন্নত বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে উদ্যোগটি।
২৫ বছরের মেয়াদে ৩০ কোটি ডলারের অর্থায়ন
এ কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আওতাধীন ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) মাধ্যমে। সংস্থাটি নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
এ অর্থায়নের মেয়াদ ২৫ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর ঋণ পরিশোধে গ্রেস পিরিয়ড বা ছাড়ের সময় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এ অর্থায়নের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, কর্মসূচিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বিপুলসংখ্যক শিশুর মৌলিক শিখনদক্ষতা বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য তারা আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হবে।





















