৭ নভেম্বর: এই দিনে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু
- আপডেট সময় : ১২:৩২:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫২৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের ক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছিল। স্বাধীনতার পর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংঘটিত এই ঘটনা নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করে। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে দিনটি আবারও রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিরে আসায় গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইতিহাসে বিপ্লব আসে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তবে প্রতিটি পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ক্যালেন্ডারের কিছু তারিখ শুধু অতীতের ঘটনা মনে করিয়ে দেয় না, বরং বর্তমানকেও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই একটি দিন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ওই সময় দেশে চলছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে বলেন, ওই সময় একাধিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। প্রথমে ফারুক-রশীদের নেতৃত্বে একদল সৈনিক অভ্যুত্থান করে। পরে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটে।
সবশেষে কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘কর্নেল তাহেরের স্ফুলিঙ্গে, বারুদের স্তূপে দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা কর্নেল তাহের জ্বালিয়েছেন। ফলে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।’
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পথ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। ফলে দিনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে।
অর্ধশতাব্দী পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
১৯৭৫ সালের ঘটনার ৫০ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ আবারও রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, ২০২৬ সালের নির্বাচন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগ দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘ সময় পর ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিরে আসায় দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। তবে শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কিংবা আনুষ্ঠানিক উদ্যাপনই কি দিনটির চেতনা বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট? এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাফিয়া সরকারের পতন এবং গণতন্ত্রের মুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রপ্রীতির বিষয়টি আবারও প্রকাশ পেয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের মানুষ সব সময় ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ৭ নভেম্বরের চেতনাকে কীভাবে ধারণ করবে বিএনপি, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার চেতনা। এই চেতনা মানুষের মধ্যে অব্যাহত থাকবে। গণতন্ত্রের জন্য যারা লড়াই করেছে, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল সেই চেতনা ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যেন পরাজিত শক্তি, ফ্যাসিবাদী শক্তি কিংবা অগণতান্ত্রিক শক্তি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব নিয়ে নানা মত ও মূল্যায়ন রয়েছে। তবে দিনটির ঘটনাপ্রবাহ দেশের ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একসময় মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের পরিবর্তন। বর্তমানে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার। নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ, ক্ষমতার পরিবর্তন ইতিহাসের একটি ঘটনা মাত্র। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা একটি চলমান প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাই পারে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে।
তাই ৭ নভেম্বর শুধু অতীতের একটি অভ্যুত্থানের স্মরণীয় দিন নয়। বরং দিনটি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—রাষ্ট্র কি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে? গণতন্ত্র কি প্রতিষ্ঠিত হবে সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অভিযাত্রা।






















