কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ, ট্রাম্পের সামনে যেসব রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
- আপডেট সময় : ০৪:৫৮:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৬০ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর ফলে দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে নীতি বাস্তবায়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধের মুখে পড়তে পারে হোয়াইট হাউস।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়বে। একই সঙ্গে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, সরকারি নথি তলব এবং বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত শুরুর সুযোগ পাবেন বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। বরং আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে নতুন করে দর-কষাকষি শুরু হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে যেসব তদন্ত হতে পারে
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্তের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদের কমিটিগুলো প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শুনানিতে ডাকতে এবং সরকারি নথিপত্র তলব করতে পারবে।
ডেমোক্র্যাটদের নজরে থাকতে পারে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও। বিশেষ করে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যবসায়িক লেনদেন খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিতে পারেন বিরোধী দলের নেতারা।
এ ছাড়া যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন-সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। এসব নথি প্রকাশে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।
পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা খাতের অর্থ কোনোভাবে ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে যাচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার আগ্রহ রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্পের কী সমস্যা হবে?
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্টের মনোনীত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদন। মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং ফেডারেল বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের সম্মতি প্রয়োজন হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দেওয়া বা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও হোয়াইট হাউসকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে। কর কমানো, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কিংবা নতুন শুল্কনীতি নিয়ে কোনো আইন পাস করতে চাইলে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ থাকলেই প্রেসিডেন্টের সব নির্বাহী সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়া সম্ভব নয়। অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির অনেক সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাহী ক্ষমতাবলে নিতে পারেন। একইভাবে কিছু শুল্ক আরোপের ক্ষমতাও তাঁকে বিদ্যমান আইনে দেওয়া হয়েছে।
তাই ডেমোক্র্যাটরা সরাসরি সব নীতি বন্ধ করতে না পারলেও শুনানি, তদন্ত, আইন প্রণয়ন এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন।
বাজেট নিয়ে অচলাবস্থা ও শাটডাউনের ঝুঁকি
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সরকারি বাজেট। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় প্রশাসনের ব্যয় ও অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব নিয়ে দর-কষাকষি বাড়তে পারে।
প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়া কিংবা অতিরিক্ত শর্ত আরোপের চেষ্টা করতে পারেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।
এ নিয়ে দুই পক্ষের সমঝোতা না হলে ২০২৭ সালে সরকারি অর্থায়ন নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এটিকে বলা হয় সরকারি শাটডাউন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও নির্বাচনের পর সরকারি অর্থায়ন এবং বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।
তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প?
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঝুঁকিগুলোর একটি হতে পারে অভিশংসন। ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি।
অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান নেতা স্টিভ স্ক্যালিসের ধারণা, নতুন কংগ্রেসের প্রথম দিন থেকেই ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ আনার ক্ষমতা প্রতিনিধি পরিষদের হাতে। সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিশংসন প্রস্তাব পাস হলে বিষয়টি সিনেটে বিচারপ্রক্রিয়ায় যায়।
তবে অভিশংসন হলেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়তে হয় না। সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে পদ থেকে অপসারণ করতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ট্রাম্পকে অপসারণ করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভব হবে না। এর জন্য প্রয়োজন হবে সিনেটের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
নির্বাচনের ফল নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চাইবেন বলে মনে করেন তিনি।
তবে একই সঙ্গে নিজের ভেটো ক্ষমতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্য, ডেমোক্র্যাটরা সহযোগিতা না করলে তিনি বিভিন্ন প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক দর-কষাকষি বাড়তে পারে।
ইসরায়েলকে আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা
নির্বাচনের ফলাফলের আভাস পাওয়ার পর ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক ৪০০ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। ৩ নভেম্বর ফক্স নিউজের একটি অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।
ট্রাম্পের দাবি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর সমঝোতা হয়েছে। ইসরায়েলের এখন আর এই সহায়তার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এ সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বাস্তবায়ন এবং এর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের একক আধিপত্যের অবসান ঘটেছে।
এই বিজয়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে যাবে। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত, বাজেট অনুমোদনে দর-কষাকষি, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে বাধা এবং নতুন আইন প্রণয়নে বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন প্রেসিডেন্ট।
তবে নির্বাচনে পরাজয় মানেই ট্রাম্পের ক্ষমতা হারানো নয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর ভেটো ক্ষমতা এবং নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। ফলে আগামী দুই বছর হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে সমঝোতা এবং রাজনৈতিক সংঘাত—দুটিই বাড়তে পারে।




















