০১:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

নারী ক্রিকেটের উন্নয়নে ৮ বিভাগে কোচ, রংপুরের দায়িত্বে বীথি

স্পোর্টস ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:৩০:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৫৪০ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

তৃণমূল পর্যায়ে নারী ক্রিকেটের প্রসার এবং নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করতে দেশের আট বিভাগে কোচিং স্টাফ নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এই উদ্যোগে রংপুর বিভাগের প্রধান কোচের দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক ক্রিকেটার ও উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা আরিফা জাহান বীথি।

একসময় অসুস্থতার কারণে পেশাদার ক্রিকেট ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। তবে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকে দূরে থাকতে পারেননি বীথি। নিজের খেলোয়াড়ি জীবন থেমে গেলেও অন্যদের ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে শুরু করেছিলেন নারী ক্রিকেট একাডেমি। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রমের পর এবার পেলেন বড় দায়িত্ব।

বিসিবির এই নিয়োগকে নিজের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন বীথি। রংপুর বিভাগের প্রধান কোচ হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ করবেন সহকারী কোচ মুর্শেদা খাতুন সোমা। বিভাগটির ম্যানেজারের দায়িত্ব পেয়েছেন মনিকা আক্তার আশা।

আট বিভাগে নারী ক্রিকেটের জন্য কোচিং স্টাফ

দেশের নারী ক্রিকেটের উন্নয়নে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি। এর অংশ হিসেবে আট বিভাগে কোচিং স্টাফ নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

নতুন এই ব্যবস্থায় বিভাগীয় পর্যায়ের নারী ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করবেন নিয়োগ পাওয়া কোচরা। পাশাপাশি প্রতিভাবান ক্রিকেটার খুঁজে বের করে তাঁদের জাতীয় পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করার কাজও করবেন তাঁরা।

বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, কোচ ও কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক ক্রিকেটার এবং কোচিংয়ের লেভেল-১ সনদধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

সাত বছরের সংগ্রামের পর বড় স্বীকৃতি

বিভাগীয় প্রধান কোচের দায়িত্ব পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন আরিফা জাহান বীথি। একই সঙ্গে দায়িত্বটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখছেন তিনি।

এ জন্য বিসিবি ও রংপুর বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বীথি।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘এই দায়িত্ব পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের, সম্মানের এবং একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রম, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার ফল আমার আজকের এই অবস্থান।’

নতুন দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার প্রত্যয় জানিয়ে বীথি আরও বলেন, ‘এই নতুন দায়িত্ব অবশ্যই আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং। তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব খেলোয়াড়দের পাশে থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিতে এবং রংপুর বিভাগের নাম আরও উজ্জ্বল করতে।’

তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দিতে চান তিনি। বীথির ভাষ্য, নতুন খেলোয়াড় তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে তা করার চেষ্টা করবেন।

যেভাবে শুরু হয়েছিল ক্রিকেটের পথচলা

২০১০ সালে পেশাদার ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন আরিফা জাহান বীথি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাব ও ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট একাডেমির হয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলেছেন তিনি।

তবে ২০১৭ সালে তাঁর ক্রিকেটজীবনে বড় ধাক্কা আসে। ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশনের একটি ম্যাচ চলাকালে হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। পরে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে নাকে ইনফেকশন শনাক্ত করেন।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, খেলা চালিয়ে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। ফলে বাধ্য হয়েই পেশাদার ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়াতে হয় তাঁকে।

কিন্তু মাঠের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাননি বীথি। খেলোয়াড় হিসেবে নিজের স্বপ্ন পূরণ না হলেও অন্যদের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেন।

বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পরও থামেননি বীথি

ক্রিকেট ছেড়ে নিজ এলাকায় ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন বীথি। এ সময় পারিবারিক ও সামাজিক নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।

পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সেই বিয়ে ভেঙে যায়। এরপরও হতাশ হয়ে থেমে থাকেননি তিনি। বরং জীবনের প্রতিকূলতাকে শক্তিতে পরিণত করে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

নিজের ক্রিকেটজীবন থেমে গেলেও অন্য মেয়েদের ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। সেই চিন্তা থেকেই গড়ে তোলেন নারী ক্রিকেট একাডেমি।

বীথির বেড়ে ওঠাও ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বাবা-মায়ের চার সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে একসময় বাবার দোকানেও কাজ করতে হয়েছে তাঁকে।

স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ক্রিকেটে ভালো করার সুবাদে জেলা পর্যায়ে খেলার সুযোগ পান। পরে ধাপে ধাপে উঠে আসেন ফার্স্ট ডিভিশনে।

বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বপ্নের একাডেমি

২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর রংপুর জেলা স্টেডিয়ামে ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন বীথি। শুরুতে প্রায় আড়াইশ নারীকে বিনা মূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি।

নারীদের ক্রিকেটে আগ্রহী করা এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। তবে একাডেমি পরিচালনা করতে গিয়ে নানা সামাজিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।

বিশেষ করে একজন নারী হিসেবে ক্রিকেট একাডেমি পরিচালনা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবু নিজের উদ্যোগ থেকে সরে আসেননি বীথি।

করোনাকালে মানবিক উদ্যোগে পাশে দাঁড়ান মানুষের

ক্রিকেটের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডেও পরিচিতি পেয়েছেন বীথি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি।

বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সহায়তায় উদ্যোগ নেন। এ জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের কাছে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার তামিম ইকবাল, রুবেল হোসেনসহ অনেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

নিজের জমানো অর্থ ও অন্যদের সহায়তায় কয়েক হাজার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টিকর সামগ্রী পৌঁছে দেন বীথি। এসব সামগ্রীর মধ্যে ছিল চাল, ডাল, তেল, লবণ, ফল, দুধ, ডিম ও হরলিকস।

পরে তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি অ্যান্ড হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’।

ক্রিকেটের পাশাপাশি সমাজসেবায় অবদান

বীথির উদ্যোগ শুধু ক্রিকেট প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর সহযোগিতায় শতাধিক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। গৃহহীন বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য তৈরি করে দিয়েছেন নতুন ঘর।

এ ছাড়া অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে ভর্তি হতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত পবিত্র কোরআন বিতরণ কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছেন।

একসময় অসুস্থতার কারণে যে বাইশ গজ ছেড়ে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে, সেই ক্রিকেটই আবার নতুন পরিচয় এনে দিয়েছে বীথিকে। এবার বিভাগীয় প্রধান কোচ হিসেবে তাঁর সামনে আরও বড় দায়িত্ব। তৃণমূলের মেয়েদের ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলা এবং জাতীয় দলের জন্য নতুন প্রতিভা তৈরি করাই হবে তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য।

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

নারী ক্রিকেটের উন্নয়নে ৮ বিভাগে কোচ, রংপুরের দায়িত্বে বীথি

আপডেট সময় : ১১:৩০:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

তৃণমূল পর্যায়ে নারী ক্রিকেটের প্রসার এবং নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করতে দেশের আট বিভাগে কোচিং স্টাফ নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এই উদ্যোগে রংপুর বিভাগের প্রধান কোচের দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক ক্রিকেটার ও উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা আরিফা জাহান বীথি।

একসময় অসুস্থতার কারণে পেশাদার ক্রিকেট ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। তবে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকে দূরে থাকতে পারেননি বীথি। নিজের খেলোয়াড়ি জীবন থেমে গেলেও অন্যদের ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে শুরু করেছিলেন নারী ক্রিকেট একাডেমি। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রমের পর এবার পেলেন বড় দায়িত্ব।

বিসিবির এই নিয়োগকে নিজের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন বীথি। রংপুর বিভাগের প্রধান কোচ হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ করবেন সহকারী কোচ মুর্শেদা খাতুন সোমা। বিভাগটির ম্যানেজারের দায়িত্ব পেয়েছেন মনিকা আক্তার আশা।

আট বিভাগে নারী ক্রিকেটের জন্য কোচিং স্টাফ

দেশের নারী ক্রিকেটের উন্নয়নে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি। এর অংশ হিসেবে আট বিভাগে কোচিং স্টাফ নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

নতুন এই ব্যবস্থায় বিভাগীয় পর্যায়ের নারী ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করবেন নিয়োগ পাওয়া কোচরা। পাশাপাশি প্রতিভাবান ক্রিকেটার খুঁজে বের করে তাঁদের জাতীয় পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করার কাজও করবেন তাঁরা।

বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, কোচ ও কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক ক্রিকেটার এবং কোচিংয়ের লেভেল-১ সনদধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

সাত বছরের সংগ্রামের পর বড় স্বীকৃতি

বিভাগীয় প্রধান কোচের দায়িত্ব পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন আরিফা জাহান বীথি। একই সঙ্গে দায়িত্বটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখছেন তিনি।

এ জন্য বিসিবি ও রংপুর বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বীথি।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘এই দায়িত্ব পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের, সম্মানের এবং একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রম, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার ফল আমার আজকের এই অবস্থান।’

নতুন দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার প্রত্যয় জানিয়ে বীথি আরও বলেন, ‘এই নতুন দায়িত্ব অবশ্যই আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং। তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব খেলোয়াড়দের পাশে থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিতে এবং রংপুর বিভাগের নাম আরও উজ্জ্বল করতে।’

তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দিতে চান তিনি। বীথির ভাষ্য, নতুন খেলোয়াড় তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে তা করার চেষ্টা করবেন।

যেভাবে শুরু হয়েছিল ক্রিকেটের পথচলা

২০১০ সালে পেশাদার ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন আরিফা জাহান বীথি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাব ও ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট একাডেমির হয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলেছেন তিনি।

তবে ২০১৭ সালে তাঁর ক্রিকেটজীবনে বড় ধাক্কা আসে। ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশনের একটি ম্যাচ চলাকালে হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। পরে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে নাকে ইনফেকশন শনাক্ত করেন।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, খেলা চালিয়ে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। ফলে বাধ্য হয়েই পেশাদার ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়াতে হয় তাঁকে।

কিন্তু মাঠের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাননি বীথি। খেলোয়াড় হিসেবে নিজের স্বপ্ন পূরণ না হলেও অন্যদের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেন।

বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পরও থামেননি বীথি

ক্রিকেট ছেড়ে নিজ এলাকায় ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন বীথি। এ সময় পারিবারিক ও সামাজিক নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।

পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সেই বিয়ে ভেঙে যায়। এরপরও হতাশ হয়ে থেমে থাকেননি তিনি। বরং জীবনের প্রতিকূলতাকে শক্তিতে পরিণত করে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

নিজের ক্রিকেটজীবন থেমে গেলেও অন্য মেয়েদের ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। সেই চিন্তা থেকেই গড়ে তোলেন নারী ক্রিকেট একাডেমি।

বীথির বেড়ে ওঠাও ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বাবা-মায়ের চার সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে একসময় বাবার দোকানেও কাজ করতে হয়েছে তাঁকে।

স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ক্রিকেটে ভালো করার সুবাদে জেলা পর্যায়ে খেলার সুযোগ পান। পরে ধাপে ধাপে উঠে আসেন ফার্স্ট ডিভিশনে।

বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বপ্নের একাডেমি

২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর রংপুর জেলা স্টেডিয়ামে ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন বীথি। শুরুতে প্রায় আড়াইশ নারীকে বিনা মূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি।

নারীদের ক্রিকেটে আগ্রহী করা এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। তবে একাডেমি পরিচালনা করতে গিয়ে নানা সামাজিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।

বিশেষ করে একজন নারী হিসেবে ক্রিকেট একাডেমি পরিচালনা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবু নিজের উদ্যোগ থেকে সরে আসেননি বীথি।

করোনাকালে মানবিক উদ্যোগে পাশে দাঁড়ান মানুষের

ক্রিকেটের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডেও পরিচিতি পেয়েছেন বীথি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি।

বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সহায়তায় উদ্যোগ নেন। এ জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের কাছে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার তামিম ইকবাল, রুবেল হোসেনসহ অনেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

নিজের জমানো অর্থ ও অন্যদের সহায়তায় কয়েক হাজার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টিকর সামগ্রী পৌঁছে দেন বীথি। এসব সামগ্রীর মধ্যে ছিল চাল, ডাল, তেল, লবণ, ফল, দুধ, ডিম ও হরলিকস।

পরে তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি অ্যান্ড হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’।

ক্রিকেটের পাশাপাশি সমাজসেবায় অবদান

বীথির উদ্যোগ শুধু ক্রিকেট প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর সহযোগিতায় শতাধিক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। গৃহহীন বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য তৈরি করে দিয়েছেন নতুন ঘর।

এ ছাড়া অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে ভর্তি হতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত পবিত্র কোরআন বিতরণ কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছেন।

একসময় অসুস্থতার কারণে যে বাইশ গজ ছেড়ে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে, সেই ক্রিকেটই আবার নতুন পরিচয় এনে দিয়েছে বীথিকে। এবার বিভাগীয় প্রধান কোচ হিসেবে তাঁর সামনে আরও বড় দায়িত্ব। তৃণমূলের মেয়েদের ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলা এবং জাতীয় দলের জন্য নতুন প্রতিভা তৈরি করাই হবে তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য।