‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি বাস্তবে পরিণত হচ্ছে: প্রধান বিচারপতি
- আপডেট সময় : ১২:৫৪:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫৪ বার পড়া হয়েছে
বিশ্বে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি দিন দিন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতাধরদের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে মানবতা ও মানবাধিকার নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের উদ্যোগে দ্বিতীয়বারের মতো এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনের বিষয় ছিল ‘সমসাময়িক বিশ্বে সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন’।
প্রধান বিচারপতি বলেন, পৃথিবীর দিকে তাকালেই ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতির অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। তবে শালীনতার খাতিরে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করতে চান না। তাঁর মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত মানবতা ও মানবাধিকারের সুরক্ষা।
মানুষের জীবনের মূল্য সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত
বর্তমান বিশ্বের মানবিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বলেন, মানুষের জীবনই এখন সবচেয়ে সহজে বিসর্জন দেওয়া যায় এমন সম্পদ। এ বিষয়ে তিনি নিজের মতের ওপর অটল রয়েছেন।
তিনি বলেন, এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এ জন্য আলাদা করে কোনো তথ্যসূত্র বা উদ্ধৃতি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। চারপাশে তাকালেই বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে মানবাধিকারের গুরুত্বও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা স্বার্থের কারণে মানুষের জীবনকে অবহেলা করা উচিত নয়।
অধিকারের আলোচনায় হারিয়ে যাচ্ছে ‘মানব’ শব্দটি
মানবাধিকারের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগের বিষয়েও কথা বলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, বাঘের অধিকার, কচ্ছপের অধিকার, শিশুদের অধিকার, শ্রমের অধিকার এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আমরা আলোচনা করি।
তবে তাঁর প্রশ্ন, অধিকারের এত বিভাজনের মধ্যে মানুষকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার তো মানবাধিকারই। আমরা অধিকারের নানা বিষয় নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, অধিকারের আগে থাকা “মানব” শব্দটিই যেন ভুলে গেছি।’
প্রধান বিচারপতির মতে, মানবাধিকারের মূল কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষ। তাই শুধু অধিকারের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে আলোচনা করলেই চলবে না। বরং মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছেন নিরপরাধ মানুষ
বিশ্বজুড়ে নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, এমন কোনো দিনের কথা কি বলা সম্ভব, যেদিন কোনো দেশ বা শহরে একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি?
তিনি আরও বলেন, ‘এমন কোনো দিনের কথা কি আপনার মনে পড়ে? আমার তো পড়ে না। তবে আমার মতের সংশোধন হলে আমি তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।’
এ সময় তিনি বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি বন্ধে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে।
সার্বভৌমত্বের পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষার আহ্বান
সম্মেলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, বর্তমান জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইনের সম্পর্ক নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক নীতি।
তবে শুধু সার্বভৌমত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিলেই হবে না। পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়ও সম্মিলিত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মতিয়ার রহমান অংশ নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. সাইদা আনজুও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ, আইন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সম্মেলনে অংশ নেন।
সম্মেলনে সমসাময়িক বিশ্বে সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।





















