নালিতাবাড়ীতে ফাতেমা রাণীর তীর্থোৎসব বৃহস্পতি-শুক্রবার
- আপডেট সময় : ০৫:১০:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৭২ বার পড়া হয়েছে
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বারোমারী সাধু লিওর খ্রিস্টধর্মপল্লীতে আগামী বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ও শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ ফাতেমা রাণীর ২৯তম বার্ষিক তীর্থোৎসব। ‘মানবতার জননী ফাতেমা রাণী মা মারিয়া’ মূলসুরকে সামনে রেখে দুই দিনব্যাপী এ উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। তীর্থোৎসবকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে পুরো তীর্থস্থান। প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি দেশ-বিদেশ থেকে আসা তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা।
উৎসবকে ঘিরে স্থানীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা এবং বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক খ্রিস্টভক্তের সমাগম ঘটবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা। তাদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, প্রার্থনা ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে এবারের তীর্থোৎসব সম্পন্ন হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের কোলে অবস্থিত বারোমারী সাধু লিওর খ্রিস্টধর্মপল্লীতে আয়োজিত এই তীর্থোৎসব দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ খ্রিস্টান ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক তীর্থযাত্রী এ উৎসবে অংশ নেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রার্থনা, মোমবাতি প্রজ্বালন ও আলোক শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে তাঁরা মা মারিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
আয়োজকদের আশা, এবারও বিপুলসংখ্যক ভক্তের উপস্থিতিতে পুরো ধর্মপল্লী মুখর হয়ে উঠবে। এ উপলক্ষে তীর্থস্থান এলাকায় সাজসজ্জা, প্যান্ডেল নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে।
১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত ধর্মপল্লী
জানা যায়, ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিওর খ্রিস্টধর্মপল্লী। পর্তুগালের ফাতেমা নগরের আদলে ও অনুকরণে ১৯৯৮ সাল থেকে এই স্থানকে বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। সময়ের পরিক্রমায় এটি বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
তীর্থস্থানটিতে স্থাপন করা হয়েছে ৪৮ ফুট উঁচু মা মারিয়ার মূর্তি। এর সামনে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল প্যান্ডেল। তীর্থোৎসবের দিন দেশ-বিদেশ থেকে আসা খ্রিস্টভক্তরা এখানে সমবেত হয়ে প্রার্থনা করেন এবং মা মারিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
আলোক শোভাযাত্রা উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ
ফাতেমা রাণীর তীর্থোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ আলোক শোভাযাত্রা। এ আয়োজনে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী মোমবাতি জ্বালিয়ে অংশ নেন। তাঁরা প্রায় দেড় কিলোমিটার পাহাড়ি পথ ধরে ক্রুশের পথ অতিক্রম করেন। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এ আয়োজন তীর্থোৎসবকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এ ছাড়া উৎসবের সূচিতে রয়েছে পুনর্মিলনী প্রার্থনা, সন্ধ্যাকালীন খ্রিস্টযাগ, সাক্রামেন্তের আরাধনা, নিশি জাগরণ, জীবন্ত ক্রুশের পথ এবং মহাখ্রিস্টযোগসহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এসব আয়োজনে অংশ নিয়ে ভক্তরা প্রার্থনা, আত্মিক সাধনা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে সময় কাটাবেন।
এবারের তীর্থোৎসবে প্রধান পুরোহিত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ময়মনসিংহ খ্রিস্টধর্ম প্রদেশের বিশপ পনেল পৌল কুবি সিএসসি।
নিরাপত্তায় চার শতাধিক পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য
তীর্থোৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, পোশাকি ও সাদা পোশাকে চার শতাধিক পুলিশ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন এপিবিএন সদস্য থাকবেন।
পাশাপাশি এসআরবি ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের নিয়মিত টহল থাকবে। পুরো খ্রিস্টধর্মপল্লীকে গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হবে। এ ছাড়া স্থাপন করা সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে তীর্থস্থান ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের কথা বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
শান্তিপূর্ণ উৎসব আয়োজনের প্রত্যাশা
আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী ধর্মপল্লীর পালপুরোহিত রেভারেন্ড ফাদার তরুণ বানোয়ারী বলেন, আবহাওয়া ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তীর্থোৎসব সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত তীর্থযাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
শেরপুরের পুলিশ সুপার মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, তীর্থোৎসব ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পোশাকি ও সাদা পোশাকে পুলিশ এবং এপিবিএন সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি এসআরবি ও বিজিবির নিয়মিত টহল থাকবে।
তিনি আরও বলেন, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা যাতে উৎসবমুখর পরিবেশে তীর্থোৎসব শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে অংশ নিতে পারেন, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রার্থনা, আলোক শোভাযাত্রা ও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার শুরু হতে যাচ্ছে ফাতেমা রাণীর ২৯তম বার্ষিক তীর্থোৎসব। আয়োজকদের প্রত্যাশা, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুই দিনের এ ধর্মীয় আয়োজন সম্পন্ন হবে।























