স্বার্থের সংঘাত ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ আইসিটি বিভাগে
- আপডেট সময় : ১২:০২:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৫৫১ বার পড়া হয়েছে
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ সাইফুল হাসানকে ঘিরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত করা, দায়িত্ব পালনে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, সরকারি অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রকল্প-তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ সাইফুল হাসান বর্তমানে ‘আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন (১৪টি)’ প্রকল্পের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্পটির মেয়াদ জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৭ এবং প্রকল্প ব্যয় ১,১১,৪৬২.৭৬ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো’–সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদে তাঁকে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সদস্য (বিনিয়োগ ও পার্ক সমন্বয়) এবং আইসিটি বিভাগের যুগ্মসচিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই কর্মকর্তার হাতে একাধিক দায়িত্ব
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মোহাম্মদ সাইফুল হাসান আইসিটি বিভাগের প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের পাশাপাশি হাই-টেক পার্ক এবং ১৪ জেলায় আইটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে তাঁর হাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, একই ব্যক্তি একদিকে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে অধীনস্থ সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং বড় প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক দায়িত্বও পালন করছেন। ফলে কোনো প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ওপর তাঁর নিজেরই সিদ্ধান্ত, তদারকি ও প্রশাসনিক প্রভাব—তিনটিই কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টন সরকারি প্রশাসনে Conflict of Interest বা স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
দায়িত্ব বণ্টনের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব বণ্টনের প্রক্রিয়াটি যে প্রশাসন শাখার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, সেই শাখার দায়িত্বেও ছিলেন সাইফুল হাসান। ফলে নিজের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এটি তদন্তের দাবি রাখে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ, নথির নোটশিট, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের মতামত এবং দায়িত্ব বণ্টনের প্রস্তাব কে তৈরি করেছিলেন—এসব নথি পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।
সরকারি অর্থে অফিস সাজানোর অভিযোগ
সাইফুল হাসানের দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিক অফিস কক্ষ নতুন করে সাজাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ১২৫ থেকে ১৫০ বর্গফুটের একটি অফিস কক্ষ সাজাতে প্রায় ৯.৮০ লাখ টাকা এবং প্রকল্প কার্যালয়ে প্রকল্প পরিচালকের জন্য বিদ্যমান কক্ষ পুনরায় সাজাতে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
তবে এসব ব্যয়ের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ক্রয় নথি, RFQ, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ এবং পূর্বের অফিস সজ্জার নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন উঠেছে—আগে থেকেই ব্যবহারযোগ্য ও সজ্জিত কক্ষ থাকার পর কেন পুনরায় সজ্জার প্রয়োজন হলো এবং একই কাজের জন্য আগে কোনো সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছিল কি না।
প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন
১৪টি জেলায় আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও সাইফুল হাসান দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি প্রকল্প তালিকায় প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয়ের উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করার কারণে প্রকল্পটির প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রকল্পের অনুমোদিত সময়সূচি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অগ্রগতি, আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতি, ক্রয় পরিকল্পনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ইভেন্ট আয়োজন ও বিল পরিশোধ নিয়ে অভিযোগ
২০২৬ সালের বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু কাজ ইভেন্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানোর কথা থাকলেও সেগুলোর অংশবিশেষ সরকারি সংস্থার কর্মীদের দিয়ে করানো হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু কর্মীর টিএ/ডিএ এবং ইভেন্ট প্রতিষ্ঠানের বিল—দুই ধরনের অর্থ পরিশোধ হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্র্যান্ডিং, প্রকাশনা, লিফলেট, স্ন্যাকসসহ কয়েকটি খাতে বাস্তবে কাজ হয়েছে কি না, তা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ইভেন্টের BOQ, কার্যাদেশ, সরবরাহকারীর বিল, গ্রহণ কমিটির প্রতিবেদন, ছবি/ভিডিও, কর্মীদের টিএ/ডিএ বিল এবং পেমেন্ট ভাউচার পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিদেশ সফরের জিও প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন
২০২৬ সালের জুলাইয়ে সিঙ্গাপুর সফরকারী পাঁচ সদস্যের একটি দলের সঙ্গে সাইফুল হাসানের থাকার বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা হয়েছে, সফরের জিও আগে জারি হলেও তা সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে যথাসময়ে প্রকাশ করা হয়নি।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে জিও জারির তারিখ, ওয়েবসাইটে আপলোডের সময়, সংশ্লিষ্ট সার্ভারের প্রকাশ-রেকর্ড এবং সফরের সরকারি অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রভাব হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
সাইফুল হাসানের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। তাঁর পিতা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস কুমিল্লা-৫ আসন থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে স্থানীয় প্রকাশনায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে কোনো কর্মকর্তার পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় থাকা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—এই পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদায়ন, বদলি বা সরকারি দায়িত্বে কোনো বেআইনি প্রভাব খাটানো হয়েছে কি না।
জুলাই আন্দোলনের মামলা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—হাই-টেক পার্কের দুই কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন পারভেজ ও শাহারিয়ার আল হাসানের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলা থাকার পরও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন এবং সাইফুল হাসানের প্রভাবে তাঁরা সুবিধা পাচ্ছেন।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি মামলা-নথি বা আদালতের নথি এই প্রতিবেদনের প্রস্তুতির সময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁদের ‘জুলাই হত্যা মামলার আসামি’ হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত না করে সংশ্লিষ্ট মামলা নম্বর, এজাহার, চার্জশিট বা আদালতের নথি প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একইভাবে, সাইফুল হাসান তাঁদের নিজের অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেছেন বা মামলা থেকে রক্ষা করার আশ্বাস দিয়েছেন—এমন দাবিও বর্তমানে অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও মামলার নথি ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
তদন্তের দাবি
অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করে তদন্তের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে—
১. দায়িত্ব বণ্টনের সব অফিস আদেশ ও নোটশিট;
২. নিজের জন্য দায়িত্ব প্রদানের প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা;
৩. অফিস সজ্জার ৯.৮০ লাখ ও ৮ লাখ টাকার ব্যয়ের বিল-ভাউচার;
৪. RFQ ও কার্যাদেশ;
৫. ১৪ জেলার প্রকল্পের ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি;
৬. ইভেন্টের BOQ, বিল ও গ্রহণ কমিটির প্রতিবেদন;
৭. বিদেশ সফরের জিও এবং প্রকাশের সময়;
৮. সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা ও আদালতের নথি—
এসব বিষয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সরকারি দায়িত্বে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ একই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হলে সেখানে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও সামনে আসে। তাই অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগগুলো অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও স্পষ্ট করা জরুরি।

























