আজ জেলহত্যা দিবস, কারাগারে নিহত হন জাতীয় চার নেতা
- আপডেট সময় : ১০:৪৯:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৬১৯ বার পড়া হয়েছে
আজ ৩ নভেম্বর, জেলহত্যা দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা। তারা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান।
বাঙালি জাতির ইতিহাসে ৩ নভেম্বর একটি শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর একই বছরের ৩ নভেম্বর কারাগারে বন্দি অবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের অনেকে এই হত্যাকাণ্ডকে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচনা করেন।
যেভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়। ওই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রাখা হয়।
৩ নভেম্বর কারাগারের ভেতরে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। প্রথমে গুলি করা হয়। পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এভাবেই প্রাণ হারান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান।
এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় থাকা অবস্থায় কারাগারের ভেতরে চার শীর্ষ জাতীয় নেতার হত্যার ঘটনা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল চার নেতার
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতীয় চার নেতা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার। পরবর্তী সময়ে স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।
সেই সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এএইচএম কামারুজ্জামান ছিলেন স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক দায়িত্বে।
মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং যুদ্ধকালীন প্রশাসনিক কার্যক্রমে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিচারপ্রক্রিয়া ও মামলার রায়
জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনায় ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর লালবাগ থানায় মামলা করেন তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল। তবে দীর্ঘদিন মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ ছিল।
১৯৯৬ সালে দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিলের পর মামলাটির তদন্ত আবার শুরু হয়। ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার আদালত রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পর ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। একই সঙ্গে আটজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।
গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ
প্রতি বছর ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়। দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয় চার নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। তাদের অবদান এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর অধ্যায়। তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিনটি বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয়।

























