২৫ বছরে পেট্রোল-অকটেনের দাম ২৩ থেকে ১৬৫ টাকা
- আপডেট সময় : ০৫:৪১:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৬৯২ বার পড়া হয়েছে
দেশে পেট্রোল ও অকটেনের দাম গত ২৫ বছরে কয়েক দফায় পরিবর্তিত হয়েছে। তবে এই পরিবর্তন সব সময় শুধু বাড়ার দিকে ছিল না। কখনো দাম বেড়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ও সরকারি মূল্য সমন্বয়ের কারণে কোনো কোনো সময়ে দাম কমেছে। পাশাপাশি কয়েক বছর একই দামও বহাল ছিল।
সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে। এতে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে পেট্রোল ছিল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা। অর্থাৎ সর্বশেষ সমন্বয়ে দুই জ্বালানির দামই লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে।
অন্যদিকে, ২০০১ সালের অক্টোবরে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ২৩ টাকা। একই সময়ে অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৫ টাকা লিটারে। ফলে ২৫ বছরের ব্যবধানে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ১৩৭ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৫৯৬ শতাংশ। আর অকটেনের দাম বেড়েছে ১৪০ টাকা বা প্রায় ৫৬০ শতাংশ।
২০০১ সালে পেট্রোল ২৩, অকটেন ২৫ টাকা
২০০১ সালের অক্টোবরে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ২৩ টাকা। একই সময়ে অকটেনের দাম ছিল ২৫ টাকা।
এরপর কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে পেট্রোলের দাম ৩৩ টাকা এবং অকটেনের দাম ৩৫ টাকায় ওঠে।
পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালের মে মাসে পেট্রোলের দাম হয় ৩৫ টাকা। একই সময়ে অকটেনের দাম ছিল ৩৫ টাকা। ২০০৬ সালের জুনে আবার দাম বাড়ে। তখন পেট্রোল ৫৬ টাকা এবং অকটেন ৫৮ টাকা লিটারে বিক্রি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও ২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে পেট্রোল ও অকটেনের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়।
২০০৮ সালে বড় মূল্যবৃদ্ধি
২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি বাজারেও।
জুলাই ২০০৮-এ পেট্রোলের দাম ৮৭ টাকা এবং অকটেনের দাম ৯০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের আগে পেট্রোলের দাম ছিল ৬৫ টাকা এবং অকটেনের দাম ৬৭ টাকা।
তবে পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করে। এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে। ২০০৮ সালের শেষ দিকে কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে পেট্রোল ৭৪ টাকা এবং অকটেন ৭৭ টাকায় নেমে আসে।
অর্থাৎ, এই সময়েই স্পষ্ট হয় যে পেট্রোল ও অকটেনের দাম সব সময় একমুখীভাবে বাড়েনি।
২০১৩ সালে আবার বাড়ে দাম
২০০৯ সালের পর আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। ২০১৩ সালে পেট্রোলের দাম ৯৬ টাকা এবং অকটেনের দাম ৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তবে কয়েক বছর পর আবার মূল্য কমানো হয়। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে পেট্রোলের দাম ৮৬ টাকা এবং অকটেনের দাম ৮৯ টাকা করা হয়।
এরপর কয়েক বছর এই দাম প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। ফলে ২০১৬ থেকে পরবর্তী কয়েক বছর পেট্রোল ও অকটেনের বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা দেখা যায়।
২০২২ সালে একবারে বড় মূল্যবৃদ্ধি
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে আমদানি ব্যয়।
এই পরিস্থিতিতে ৫ আগস্ট রাতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বড় পরিসরে বাড়ানো হয়। তখন পেট্রোলের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়। অর্থাৎ একবারে লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ে।
অন্যদিকে, অকটেনের দাম ৮৯ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা করা হয়। ফলে অকটেনের দাম বাড়ে ৪৬ টাকা।
তবে এই মূল্য দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। ২৯ আগস্ট পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে কমানো হয়। ফলে পেট্রোল ১২৫ টাকা এবং অকটেন ১৩০ টাকায় নেমে আসে।
২০২৪ থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু হয়। ২০২৪ সাল থেকে এই প্রক্রিয়ায় নিয়মিত মূল্য পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেট্রোলের দাম ছিল ১২৭ টাকা। একই সময়ে অকটেনের দাম ছিল ১৩১ টাকা।
তুলনা করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে পেট্রোলের দাম ছিল ৭৪ টাকা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে ১২৭ টাকা হয়। অর্থাৎ ১৫ বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা।
একইভাবে, অকটেনের দাম ৭৭ টাকা থেকে বেড়ে ১৩১ টাকা হয়। ফলে বেড়েছে ৫৪ টাকা।
২০২৬ সালে কয়েক দফায় পরিবর্তন
২০২৬ সালেও পেট্রোল ও অকটেনের দাম একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে।
বছরের শুরুতে ফেব্রুয়ারিতে পেট্রোলের দাম ছিল ১১৬ টাকা। অকটেন ছিল ১২০ টাকা।
এরপর এপ্রিলে দাম বাড়ানো হয়। পেট্রোলের দাম হয় ১৩৫ টাকা। অকটেনের দাম দাঁড়ায় ১৪০ টাকা।
পরবর্তী সময়ে আবার মূল্য সমন্বয় করা হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল।
২১ সেপ্টেম্বর পেট্রোল-অকটেনে ২০ টাকা বৃদ্ধি
সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
ফলে পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬০ টাকা। অন্যদিকে, অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬৫ টাকা।
এটি ২০২৬ সালের সবচেয়ে সাম্প্রতিক বড় মূল্য সমন্বয়। একই সময়ে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
২৫ বছরে কতটা বেড়েছে পেট্রোলের দাম
২০০১ সালের অক্টোবরে এক লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ২৩ টাকা। বর্তমানে একই পরিমাণ পেট্রোলের দাম ১৬০ টাকা।
অর্থাৎ ২৫ বছরে প্রতি লিটারে দাম বেড়েছে ১৩৭ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৫৯৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০০১ সালে অকটেনের দাম ছিল ২৫ টাকা। বর্তমানে তা ১৬৫ টাকা।
ফলে ২৫ বছরে অকটেনের দাম বেড়েছে ১৪০ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৫৬০ শতাংশ।
অর্থাৎ, দুই জ্বালানির ক্ষেত্রেই ২০০১ সালের তুলনায় বর্তমান দাম কয়েক গুণ বেশি।
বিভিন্ন সময়ে পেট্রোল ও অকটেনের দাম
| সময় | পেট্রোল | অকটেন |
|---|---|---|
| ২০০১ সালের অক্টোবর | ২৩ টাকা | ২৫ টাকা |
| ২০০৬ সালের জুন | ৫৬ টাকা | ৫৮ টাকা |
| ২০০৯ সালের জানুয়ারি | ৭৪ টাকা | ৭৭ টাকা |
| ২০১৬ সালের এপ্রিল | ৮৬ টাকা | ৮৯ টাকা |
| ২০২২ সালের আগস্ট | ১৩০ টাকা | ১৩৫ টাকা |
| ২০২৪ সালের জুলাই | ১২৭ টাকা | ১৩১ টাকা |
| ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি | ১১৬ টাকা | ১২০ টাকা |
| ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬০ টাকা | ১৬৫ টাকা |
তালিকাটি দেখলে বোঝা যায়, পেট্রোল ও অকটেনের দাম সব সময় ধারাবাহিকভাবে বাড়েনি। ২০০৮ সালের উচ্চমূল্যের পর ২০০৯ সালে দাম কমেছিল।
একইভাবে, ২০১৩ সালের মূল্যস্তর থেকে ২০১৬ সালে দাম কমানো হয়। এরপর কয়েক বছর তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।
তবে ২০২২ সালে আবার বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়। পরবর্তী সময়ে কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালে আবার দ্রুত দাম বেড়েছে।
কেন পেট্রোল ও অকটেনের দাম পরিবর্তন হয়
জ্বালানি তেলের দাম পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অন্যতম।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়ে। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া, বীমা ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবও পড়ে।
এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে।
সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কথা জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসানের চাপও বেড়েছে।
দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ে কী প্রভাব পড়ে
পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেলের ব্যয় বাড়ে না। এর প্রভাব পরিবহন ও ব্যবসার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।
কারণ, জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের খরচ বাড়ার সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে জ্বালানি-নির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ও পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে কোনো পণ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা শুধু জ্বালানি মূল্যের ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার পরিস্থিতিও এতে ভূমিকা রাখে।
২৫ বছরের হিসাব
সব মিলিয়ে ২০০১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পেট্রোল ও অকটেনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে পুরো সময়জুড়ে দাম শুধু ঊর্ধ্বমুখী ছিল না।
কখনো বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কখনো দাম কমানো হয়েছে। পাশাপাশি কয়েক বছর একই মূল্যও বহাল ছিল।
সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে প্রতি লিটার পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে ২০০১ সালের তুলনায় পেট্রোলের দাম প্রায় ছয় গুণ এবং অকটেনের দামও কয়েক গুণ বেড়েছে।
তাই গত ২৫ বছরের জ্বালানি তেলের মূল্য ইতিহাসে শুধু দাম বৃদ্ধির হিসাব নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার এবং সরকারি মূল্য সমন্বয়ের ধারাও গুরুত্বপূর্ণ।


























