শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানে কঠোর হচ্ছে শিক্ষা প্রশাসন
- আপডেট সময় : ১২:৩৫:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৫৪ বার পড়া হয়েছে
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে শিক্ষা প্রশাসন। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, পাঠদানের স্বীকৃতি বাতিল এবং এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছে। একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশে ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান, পাঠদান কার্যক্রম এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড।
এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন শূন্য পাস করা ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাড়ছে শূন্য পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪২টি। ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫টিতে। ২০২৫ সালে এক লাফে তা বেড়ে হয় ২০২টি।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১৮১টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ৫৫টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে সবচেয়ে বেশি ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। রাজশাহী বোর্ডে এ সংখ্যা ৩৯টি। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের ১৯টি প্রতিষ্ঠানের ১০২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে।
তিন ধাপে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে শিক্ষা প্রশাসন। এ ক্ষেত্রে গত পাঁচ বছরের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানে একবার শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে।
একই সময়ে দুবার এমন ফল হলে প্রতিষ্ঠানটির পাঠদানের স্বীকৃতি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর তিনবার শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করলে প্রতিষ্ঠানটির এমপিও বন্ধের সুপারিশ করা হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের এমপিও সরাসরি বন্ধ না করে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বদলির সুপারিশ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পাঁচ বছরের ফলাফল যাচাই, জবাবদিহিতে শিক্ষকরা
শুধু প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ডেকে ব্যাখ্যা চাওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না শিক্ষা বোর্ড। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বলবেন বোর্ড কর্মকর্তারা।
এ সময় গত পাঁচ বছরের শিক্ষার্থী সংখ্যা, পাসের হার, শিক্ষকসংখ্যা এবং শিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে শূন্য পাসের পেছনে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হবে।
এরপর সুপারিশসহ প্রতিবেদন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে পাঠদানের ঘাটতি, শিক্ষক সংকট কিংবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
ঢাকা বোর্ডের ২৫ প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি
জাতীয় পর্যায়ের পরিস্থিতির পাশাপাশি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ১০২ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শূন্য পাস করা এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বোর্ডের তালিকা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঢাকার তিনটি, ফরিদপুরের চারটি, গাজীপুরের একটি, গোপালগঞ্জের একটি, কিশোরগঞ্জের দুটি, মানিকগঞ্জের দুটি, মুন্সীগঞ্জের তিনটি, নারায়ণগঞ্জের দুটি, রাজবাড়ীর দুটি, শরীয়তপুরের একটি এবং টাঙ্গাইলের চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ঢাকার তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো ই. হক কলেজ, সিটি মডেল কলেজ ও এশিয়ান আইডিয়াল কলেজ।
ফরিদপুরের কবি জসীম উদ্দীন উচ্চবিদ্যালয়, মেঘচামী আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাজী সিরাজুল ইসলাম গার্লস হাই স্কুল এবং সাঈদা সাজেদা চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করেনি।
এ ছাড়া গাজীপুরের জালাল উদ্দিন মাস্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং গোপালগঞ্জের দুর্বাসুর মডেল হাই স্কুলও রয়েছে এই তালিকায়।
কিশোরগঞ্জের কিশোরগঞ্জ সিটি কলেজ ও আবুল কাশেম কলেজ এবং মানিকগঞ্জের ড. আবদুর রহিম খান মহিলা কলেজ ও গোলাম মনির হোসেন মহিলা কলেজে শূন্য পাসের ফল এসেছে।
মুন্সীগঞ্জের মদিনীমণ্ডল গার্লস কলেজ, রাইদা অভয় পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও হাসাড়াখালি কিশোর উচ্চবিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জের নবীগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকেও কেউ পাস করেনি।
অন্যদিকে, রাজবাড়ীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আবদুল জব্বার কলেজ ও কাচারী পাড়া হাই স্কুল এবং শরীয়তপুরের নগর পাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ রয়েছে তালিকায়। টাঙ্গাইলের আলোয়া হাই স্কুল, খন্দকার আসাদুজ্জামান একাডেমি, শিমলা পাবলিক হাই স্কুল ও সুরা তরুণ শিক্ষাঙ্গণ থেকেও কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার
গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত ২২ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পাসের হার।
মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী।
গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন। সেই হিসাবে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন।
সার্বিক ফলাফলের এই অবনতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষা প্রশাসনের পরিকল্পিত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
























