ইসরায়েলে ক্ষমতার পালাবদল অনিশ্চিত, তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকছেন নেতানিয়াহু
- আপডেট সময় : ০১:৪৫:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬০ বার পড়া হয়েছে
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না আসায় দেশটির সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলেও আপাতত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। নতুন সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে আগামী বছর সম্ভাব্য আরেকটি নির্বাচন পর্যন্তও তার দায়িত্বে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে নেতানিয়াহুর জোট
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। বুধবার (২৮ অক্টোবর) পর্যন্ত প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেশটির তিনটি প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি, কট্টর ডানপন্থি ও অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর জোট ৫৩টি আসন পেতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৮। এ ছাড়া ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই হিসাব অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন হবে।
তবে ভোট গণনা এখনো চলমান থাকায় চূড়ান্ত ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেলেও প্রাথমিক পূর্বাভাসে সেই জোট পিছিয়ে রয়েছে।
কেন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকছেন নেতানিয়াহু
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেই বিদ্যমান প্রধানমন্ত্রীকে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব ছাড়তে হয় না। নতুন সরকার গঠন এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নিয়ে কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকে। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ে সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউটের গবেষক গাই লুরি জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা নিয়মিত সরকারের মতোই। তবে এ ধরনের সরকারের ক্ষেত্রে সংযম বজায় রাখার দায়িত্ব থাকে এবং কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা কতটা এগোয়, তার ওপর ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
শক্তিশালী ডানপন্থি সরকার গঠনের আহ্বান নেতানিয়াহুর
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ভোর ৩টার পর নিজের দল লিকুদ পার্টির সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। এ সময় তিনি একটি ‘শক্তিশালী ডানপন্থি জাতীয় সরকার’ গঠনের আহ্বান জানান।
বক্তব্যে তিনি ইসরায়েলের সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের কাছ থেকে আসা হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করার ক্ষেত্রে দুই দেশের সামনে একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প ইসরায়েলি ভোটারদের প্রতি নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইরানকে ঘিরে দুই দেশের সামরিক লক্ষ্য পূরণের প্রসঙ্গও তুলেছিলেন তিনি।
নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহু ‘খুব ভালো করেছেন’। তার দাবি, নেতানিয়াহুর প্রতি নিজের সমর্থন নির্বাচনে তাকে সহায়তা করেছে।
আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে জটিলতা
নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের সামনে সরকার গঠনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়া। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব দল সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে। ফলে তাদের সমর্থন সরকার গঠনের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে ইসরায়েলের অনেক ইহুদি রাজনৈতিক নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করেন। এ কারণে বিরোধী জোটের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন—এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটও। তবে তিনি নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
আইজেনকট নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান ও সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ অবস্থায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কর্মকর্তাদের যেকোনো ধরনের চাপের মুখে দৃঢ় থাকা উচিত।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর দপ্তর এর আগে ইরান সংঘাতকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের কাজে ব্যবহারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিল।
নির্বাচনের প্রভাব পড়েছে আর্থিক বাজারে
নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব ইসরায়েলের আর্থিক বাজারেও দেখা গেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইসরায়েলি মুদ্রা শেকেলের মান প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি ডলারে ৩ দশমিক ১০ শেকেলে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে তেল আবিবের প্রধান শেয়ারবাজার সূচকগুলোও ৩ শতাংশের বেশি কমেছে।
তবে বাজারের এই ওঠানামার পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ছাড়াও অন্যান্য অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থার প্রভাব
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হিসাবে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে একাধিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ইসরায়েল।
গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি ঘটেছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সেখানে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৪ হাজারে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তিনি এসব অভিযোগকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসরায়েলে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও চলছে। নেতানিয়াহু এসব মামলাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করে আসছেন।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের প্রাথমিক পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তার তাৎক্ষণিক বিদায়ের পথ তৈরি হয়নি। বরং নতুন সরকার গঠন, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতাই এখন ইসরায়েলের ক্ষমতার পালাবদলের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




















