ফ্রান্স থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের উত্তাপ
ইউরোপে কি আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি, ৯ দেশে বিক্ষোভ কি সমন্বিত?
- আপডেট সময় : ১২:৪৫:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪২ বার পড়া হয়েছে
ইউরোপের অন্তত নয়টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ ও অসন্তোষ। ফ্রান্স, ইতালি ও আলবেনিয়া থেকে শুরু করে স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় তরুণ ও শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রতিবাদে বিভিন্ন শহরে আন্দোলন চলছে। কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইউরোপের এই আন্দোলনকে ঘিরে ২০১০-১১ সালের আরব বসন্তের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। ওই সময় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গণবিক্ষোভের মধ্য দিয়ে একাধিক স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। তবে ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভগুলো একই সূত্রে গাঁথা কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও সেগুলোকে একটি সমন্বিত বিদ্রোহ হিসেবে দেখার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
২০২৬ সালে প্যারিস, মিলান, মাদ্রিদ ও তিরানাসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তরুণদের ক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নাগালের বাইরে চলে যাওয়া বাড়িভাড়া, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা আন্দোলনকে আরও জোরালো করেছে।
ফ্রান্স থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের উত্তাপ
১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে ফ্রান্সে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ১১০টি বিক্ষোভে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ। বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
লিমোজেস ও মার্সেইতেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থি রাজনীতিক মারিন ল্য পেন অভিবাসনকে কেন্দ্র করে বক্তব্য দেন। তবে আন্দোলনের পেছনে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এইচইসি প্যারিসের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নোর মতে, ফ্রান্সের আন্দোলন ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিক্ষোভের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ। শিক্ষা খাতে অর্থের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান বিভিন্ন দেশের তরুণদের মধ্যে অভিন্ন ক্ষোভ তৈরি করেছে।
ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় সহিংস পরিস্থিতি
ইতালিতে ১৬ অক্টোবর ‘নো মেলোনি ডে’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে বাজেট কমানোর প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েও অসন্তোষ দেখা দেয়। রোম ও তুরিনে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল করে প্রতিবাদ জানান। ১৭ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে পাথর ছোড়ে এবং ব্যারিকেডে আগুন দেয়।
বেলজিয়ামেও শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই ও অতিরিক্ত ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। লিয়েজ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন বিক্ষোভের সময় সংঘটিত সহিংসতার নিন্দা জানান।
আলবেনিয়ায় আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও সরকারের প্রতি অসন্তোষ। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে ১৭ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে হাজারো তরুণ বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে।
এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বিতর্কিত উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরেও ক্ষোভ রয়েছে। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলেও এদি রামা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য আন্দোলনকে ব্যবহার করছে।
আবাসন সংকট তরুণদের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে
স্পেন ও পর্তুগালে বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ আবাসন সংকট। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং আয়ের তুলনায় আবাসনের ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকোরমেন আব্যাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পর তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোস্ট্যাটের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ অপরিসর ও অতিরিক্ত জনাকীর্ণ বাড়িতে বসবাস করতে বাধ্য হন।
পর্তুগালের লিসবন ও পর্তো শহরেও উচ্চ বাড়িভাড়া ও কম বেতনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। ১৪ অক্টোবর রাতে পর্তোতে বিক্ষোভকারীদের তাঁবু সরানোর সময় পুলিশের লাঠিচার্জে ৩৭ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
অন্যদিকে, জার্মানির বার্লিনে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের প্রতিও সংহতি জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ছাঁটাই এবং গ্রিসে আবাসন সংকট ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
আরব বসন্তের সঙ্গে কতটা মিল?
মার্কিন-কুয়েতি সাংবাদিক আহমেদ এলদিন ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আরব বসন্তের তুলনা করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, অর্থনৈতিক সংকট ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভই দুই পরিস্থিতির মধ্যে অন্যতম মিল।
ভারতীয়-আমেরিকান কংগ্রেসম্যান রো খান্নাও ইউরোপের বিক্ষোভের পেছনে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্যারিসের স্কুল থেকে মাদ্রিদ ও তিরানার রাজপথ পর্যন্ত তরুণদের প্রধান আকাঙ্ক্ষা হলো—অর্থনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে একটি বিশ্বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
উদ্যোক্তা হ্যারি হালপিন ও পডকাস্টার পিটার ম্যাককরম্যাকও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মূল্যস্ফীতি এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাকে বিশ্বজুড়ে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি আরব বসন্তের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। আরব বসন্তের সময় বহু দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। বিপরীতে, ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই নির্বাচনী ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
২০২৬ সালের জুনে ডাচ টিইউআই ফাউন্ডেশনের ৮ হাজার ২৪ জন ইউরোপীয় তরুণের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ বাবা-মায়ের প্রজন্মের তুলনায় খারাপ হবে। বিপরীতে, মাত্র ২৫ শতাংশ তরুণ তাঁদের ভবিষ্যৎ আরও ভালো হবে বলে আশা করেন।
এই পরিসংখ্যান তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের একটি চিত্র তুলে ধরে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রাজপথের আন্দোলনকে তীব্র করে তুলতে পারে।
তবে বিভিন্ন দেশের আন্দোলন একই পরিকল্পনা বা নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ প্রতিবেদনে উঠে আসেনি। বরং পৃথক দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আন্দোলনগুলোকে প্রভাবিত করছে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভকে এখনই আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি বলা কঠিন। তবে তরুণদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈষম্য ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এসব সংকটের কার্যকর সমাধান না হলে আগামী দিনে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে





















