এআইয়ের যুগে সপ্তাহে তিন দিন কাজ করেই চলবে: জেফ বেজোস
- আপডেট সময় : ০৪:০১:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৩৬ বার পড়া হয়েছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নয়নের ফলে ভবিষ্যতে মানুষের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ করেও পরিবারের ভরণপোষণ করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি মানুষ কম সময় কাজ করতে চাইলে বিভিন্ন খাতে কর্মী নিয়োগ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস।
গত বুধবার (৭ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে এআইয়ের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান, মহাকাশ গবেষণা, চাঁদে মানুষের বসতি স্থাপন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন এই ধনকুবের।
এআই বাড়াবে উৎপাদনশীলতা, কমবে কাজের সময়
জেফ বেজোসের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহারে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। ফলে জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষকে আগের মতো দীর্ঘ সময় কাজ করতে হবে না। এমনকি পরিবারের একাধিক সদস্যের আয় করার বাধ্যবাধকতাও কমে আসতে পারে।
বেজোস বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়লে কেউ সপ্তাহে তিন দিন কাজ করেই পরিবারের ভরণপোষণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাঁর মতে, অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম সুফল হবে এটি।
তিনি আরও মনে করেন, এআইয়ের কারণে মানুষকে জীবিকা নির্বাহের জন্য একাধিক চাকরি করতে হবে না। ফলে কর্মীদের অতিরিক্ত সময় কাজ করানোর প্রয়োজনও কমতে পারে। এর প্রভাব পড়বে শ্রমবাজারে। কারণ, মানুষ যদি কম কাজ করেই প্রয়োজনীয় আয় করতে পারেন, তাহলে বাড়তি চাকরি করার আগ্রহ কমে যেতে পারে।
অ্যামাজনের কর্মী ছাঁটাই নিয়ে যা বললেন
সাক্ষাৎকারে অ্যামাজনের কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়টিও উঠে আসে। উপস্থাপক ব্রেট বেয়ার জানান, গত বছরের শেষ দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটি করপোরেট পর্যায়ে প্রায় ৩০ হাজার পদ বিলুপ্ত করেছে।
জবাবে বেজোস বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির সময় অ্যামাজন ব্যাপকভাবে কর্মী নিয়োগ করেছিল। সে কারণে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত নেতিবাচক পূর্বাভাসের সঙ্গে একমত নন বেজোস। তাঁর মতে, প্রযুক্তির উন্নয়ন অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এআই বিনিয়োগে সতর্ক থাকার পরামর্শ
এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও এ খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বেজোস। তাঁর মতে, এআই একটি বাস্তব প্রযুক্তি এবং এর কার্যকর প্রয়োগ রয়েছে। তবে এই প্রযুক্তি থেকে মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ পাচ্ছে, যাদের সব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল নাও হতে পারে।
এআই খাতে বিনিয়োগের বর্তমান পরিস্থিতিকে বুদ্বুদ বলা যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি নির্ধারণ করা কঠিন। তবে বিনিয়োগের বাজারে ধস নামলেও উদ্ভাবনের সুফল হারিয়ে যায় না।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জীবপ্রযুক্তির বিকাশে তৈরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং ইন্টারনেটের প্রসারের সময় স্থাপন করা ফাইবার-অপটিক কেব্লের কথা উল্লেখ করেন।
এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বেজোসের মত, নতুন প্রযুক্তির বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ না করে এর ক্ষতিকর ব্যবহার ঠেকানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ছুরির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার পরিবর্তে হত্যা প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে সামগ্রিকভাবে সীমাবদ্ধ না করে এর বিপজ্জনক ব্যবহার ও অপব্যবহার বন্ধ করার পক্ষে তিনি।
এআই দিয়ে প্রকৌশলকাজ সহজ করার পরিকল্পনা
বেজোসের সহপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান প্রমিথিউসেও এআই নিয়ে কাজ চলছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, এমন একটি ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইঞ্জিনিয়ার’ তৈরি করা, যা মানুষকে নিজেদের ধারণাকে বাস্তব পণ্যে রূপ দিতে সহায়তা করবে।
বেজোসের ভাষ্য, এমন সরঞ্জাম তৈরি করা হবে, যেগুলো ব্যবহার করা এতটাই সহজ হবে যে প্রায় যে কেউ প্রকৌশলসংক্রান্ত কাজে অংশ নিতে পারবেন। তাঁর ধারণা, এআই অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে উৎপাদনশীলতা দুই অঙ্কের হারে বাড়াতে পারে।
মহাকাশে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা
এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্যকেন্দ্রের চাহিদাও বাড়ছে। এসব কেন্দ্রের বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মহাকাশে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান বেজোস।
তিনি বলেন, তাঁর মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিনের ‘প্রজেক্ট সানরাইজ’-এর আওতায় ৫০ হাজারের বেশি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) কাছে আবেদন করা হয়েছে। এসব উপগ্রহকে কক্ষপথে তথ্যকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বেজোসের মতে, মহাকাশে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর আশা
মহাকাশ গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের চেয়ে এগিয়ে রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বেজোস। তাঁর বিশ্বাস, ২০২৮ সালের মধ্যেই চাঁদে মানুষ পাঠানো সম্ভব। এ লক্ষ্য অর্জনে নাসা ও ব্লু অরিজিন কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
তবে চাঁদে মানুষ পাঠানোই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য নয়। সেখানে স্থায়ী মানববসতি গড়ে তুলতে নিয়মিত পণ্য ও সরঞ্জাম পাঠানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
চাঁদের মাটি ব্যবহার করে সৌরকোষ তৈরি এবং সেখানকার অক্সিজেন রকেটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন বেজোস। তাঁর মতে, পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের কারণে চাঁদ ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও চাঁদকে বাদ দিয়ে সরাসরি মঙ্গলে যাওয়ার চিন্তার পক্ষে নন তিনি। বরং চাঁদে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলাকে ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
রকেট উৎক্ষেপণ বাড়াতে চায় ব্লু অরিজিন
ব্লু অরিজিনের রকেট উৎক্ষেপণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানান বেজোস। গত মে মাসে ইঞ্জিন পরীক্ষার সময় বিস্ফোরণের ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটি ডিসেম্বর মাসে তাদের ‘নিউ গ্লেন’ রকেট আবার উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পরবর্তী উৎক্ষেপণে ‘ব্লু রিং’ নামের একটি যান বহন করা হবে। যানটি বিভিন্ন কক্ষপথে এবং আরও দূরের মহাকাশে সরঞ্জাম ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে একটি উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে বছরে ১২ বার রকেট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা বাড়িয়ে ৫০ বারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য আরও তিনটি উৎক্ষেপণকেন্দ্র নির্মাণ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বেজোসের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য আরও উচ্চাভিলাষী। তিনি বলেন, প্রথমে প্রতিদিন রকেট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জন করতে চান। এরপর সেই সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতি ঘণ্টায় এবং শেষ পর্যন্ত প্রতি মিনিটে একটি করে উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে এগোতে চান।
ব্লু অরিজিনে ২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ
বেজোস জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ব্লু অরিজিনে ২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। কয়েক বছর পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থায়ন লাভজনক হবে বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাইরের বিনিয়োগ নিতে চাননি তিনি।
ধনকুবেরদের সমালোচনার জবাব
সাক্ষাৎকারে ধনকুবেরদের ভূমিকা নিয়ে রাজনীতিকদের সমালোচনারও জবাব দেন বেজোস। স্বাধীন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের ধনকুবেরবিরোধী বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সফল ব্যবসা গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাকে নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত নয়।
বাড়ির উচ্চমূল্যের কারণে তরুণদের কর্মস্থলের কাছাকাছি বসবাস করতে না পারার সমস্যাকে বাস্তব বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে তাঁর মতে, আবাসনের চাহিদায় ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজ সীমিত রাখলে বাড়ির দাম আরও বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে অস্টিন শহরের উদাহরণ টেনে আবাসন নির্মাণ সহজ করার পক্ষে মত দেন তিনি।
বেজোসের ভাষ্য, কোনো রাজনীতিক যদি শুধু দোষারোপ করতে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে তাঁর কাছে কার্যকর সমাধান না থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এআইয়ের উন্নয়নকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও কর্মজগতের বড় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছেন জেফ বেজোস। তাঁর ধারণা, প্রযুক্তির অগ্রগতিতে উৎপাদনশীলতা বাড়লে মানুষের কাজের সময় কমতে পারে। একই সঙ্গে মহাকাশ গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে এআইয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি বিনিয়োগের ঝুঁকি ও প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকানোর বিষয়েও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।



























