কারাগারে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ৭ দফা নির্দেশনার বাস্তবায়ন ৯০ শতাংশ
- আপডেট সময় : ০২:২৮:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪৪ বার পড়া হয়েছে
দেশের কারাগারগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাত দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে কারা অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে এসব নির্দেশনার প্রায় ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর। বাকি কার্যক্রমও দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারাগারের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানো, দায়িত্ব পালনে অবহেলা বন্ধ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি কারাগারে নজরদারি ও তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিম এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সাত দফা নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কারা অধিদপ্তর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করেছে। সারা দেশের প্রতিটি কারাগারে প্রতিদিন তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সব কারাগারকে নিয়মিতভাবে অধিদপ্তরের কাছে অগ্রগতি ও মতামত জমা দিতে হচ্ছে।
সাত দফা নির্দেশনায় যেসব বিষয় রয়েছে
কারাগারের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সাতটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—
1. লকআপের পরবর্তী কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
2. প্রতিটি কারাগারে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা।
3. দায়িত্বের নির্ধারিত স্থান থেকে অননুমোদিত অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
4. তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
5. দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারী কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা।
6. বৃষ্টি, বজ্রপাতসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
7. আকস্মিক পরিদর্শন ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা।
লকআপের পরবর্তী কার্যক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ
নির্দেশনা অনুযায়ী, লকআপের পর কারাগারের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এ সময় কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
তবে বিশেষ প্রয়োজনে কোনো ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নিতে হলে জেলারের লিখিত অনুমোদন থাকতে হবে। একই সঙ্গে কার্যক্রমের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারেও বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি বাধ্যতামূলক
কারাগারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেখানে সম্ভব, সেখানে পৃথক পর্যবেক্ষণ কক্ষ স্থাপন করতে হবে।
এসব কক্ষে প্রশিক্ষিত ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কারারক্ষীদের দায়িত্ব দিতে হবে। কোনো কারাগারে পৃথক পর্যবেক্ষণ কক্ষ না থাকলে উপযুক্ত স্থানে মনিটর স্থাপন করে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিম বলেন, নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি এড়াতে দায়িত্বের নির্ধারিত স্থান থেকে অননুমোদিত অনুপস্থিতির বিষয়ে শূন্য-সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
কোনো প্রহরী বা পাহারাদার কর্মী অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করলে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হবে। পাশাপাশি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে
নির্দেশনায় শুধু দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মীদের নয়, তাঁদের তত্ত্বাবধানে থাকা কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
কোনো অবহেলা বা অননুমোদিত অনুপস্থিতির ঘটনা গোপন করা হলে সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা জানাতে বিলম্ব করা কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলেও তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে।
অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানান, নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে অপারেশনাল শাখাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডেপুটি জেলারসহ অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দেশের বিভিন্ন কারাগারের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত করা হবে।
অবহেলাকারীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও বদলির উদ্যোগ
কারা অধিদপ্তরের নির্দেশনায় দায়িত্ব পালনে বারবার অবহেলার অভিযোগ পাওয়া কর্মীদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাঁদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করতেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অন্য কারাগারে বদলি করা হতে পারে। পাশাপাশি প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।
কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিম বলেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য দোষী সাব্যস্ত কারা কর্মীদের আন্তঃকারাগারে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বৃষ্টি ও বজ্রপাতসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় কারাগারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ সময় প্রহরীদের নির্ধারিত দায়িত্বস্থলে অবস্থান করতে হবে। দায়িত্ব পালনের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতাও বজায় রাখতে হবে।
এ ছাড়া কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট, জেলার ও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত তত্ত্বাবধান এবং আকস্মিক পরিদর্শন পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিদর্শনের সময় নিরাপত্তা চৌকি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, প্রহরীদের দায়িত্ব পালন এবং সার্বিক নিরাপত্তা কার্যক্রম পরীক্ষা করতে হবে। কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তা দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সুফল দৃশ্যমান হওয়ার আশা
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিম জানান, সাত দফা নির্দেশনার অন্তত ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এসব পদক্ষেপের সুফল দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছে অধিদপ্তর।
উল্লেখ্য, গত আগস্টে কারাগারের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতে সাত দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। ওই নির্দেশনায় সতর্ক করা হয়েছিল, কারাগারের অভ্যন্তরে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুরো কারা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। একই সঙ্গে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
নিরাপত্তার ত্রুটি প্রতিরোধ, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কারা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এসব নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কারা অধিদপ্তর।





















