শিশু হত্যার ঝুঁকি বাড়ছে, পরিচিতজনদের হাতেই বেশি প্রাণহানি
- আপডেট সময় : ০৪:৩০:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫২৮ বার পড়া হয়েছে
দেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে খুন বা সহিংসতার ঘটনায় ১৫৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে নিজেদের ঘর ও পারিবারিক পরিবেশ। অনেক ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসছে বাবা-মা, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক বা পরিচিতজনদের নাম।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত খুন বা সহিংসতার পর ১৫৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল ১৮৬। অন্যদিকে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ ১৫ হাজারের বেশি শিশু
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যে আরও বড় চিত্র উঠে এসেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু।
নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে ৯ বছর পর্যন্ত বয়সী ৬৮ জন এবং ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ৯৭০ জন। পুলিশ বলছে, বিভিন্ন কারণে শিশু নিখোঁজ হয়। অনলাইন সাধারণ ডায়েরি (জিডি) চালুর কারণেও নিখোঁজের অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুদের উদ্ধারে কর্তৃপক্ষ কতটা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং নিখোঁজ শিশুকে জীবিত উদ্ধারে সমন্বিত উদ্যোগ কতটা কার্যকর।
শিশু হত্যায় পরিবারই বড় ঝুঁকি
শিশু অধিকার সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ১২৪ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। একই বছর শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩০৮টি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২৪ শিশু হত্যার মধ্যে ৬৪টি ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা জড়িত ছিল। এর মধ্যে ৩৮টি ঘটনায় বাবা-মা এবং ২৬টি ঘটনায় নিকট আত্মীয়ের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। আরও ১৮টি ঘটনায় প্রতিবেশী বা পরিচিত এবং ১৫টি ঘটনায় শিক্ষক বা মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে।
হত্যার ৬৬ দশমিক ১২ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে পারিবারিক পরিবেশে, শিশুর নিজের ঘর বা আত্মীয়ের বাড়িতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটেছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, ঝোপঝাড়, মাঠ বা নির্জন স্থানে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ, জলাশয়ে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং রাস্তায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ ঘটনা।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে ছোট শিশুরা
‘শিশুরাই সব’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিহত ১২৪ শিশুর মধ্যে ৬৪ জনের বয়স ছিল ০ থেকে ৬ বছর। অর্থাৎ মোট নিহত শিশুর ৫১ দশমিক ৬১ শতাংশই ছিল এই বয়সী।
৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু ছিল ৩৭ জন। আর ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ছিল ১২ জন। নিহতদের মধ্যে ৬৩ জন মেয়ে এবং ৫৯ জন ছেলে। দুজনের লিঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। সেখানে ৩৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সিলেট ও বরিশালে সবচেয়ে কম পাঁচটি করে ঘটনা পাওয়া গেছে।
পারিবারিক কলহে হত্যার ঘটনা বেশি
প্রতিবেদনে হত্যার প্রধান কারণ হিসেবে পারিবারিক কলহ ও দ্বন্দ্বের কথা বলা হয়েছে। এমন ঘটনা ছিল ৪৭টি, যা মোট ঘটনার ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
এরপর রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ, মুক্তিপণ ও অপহরণ এবং মাদরাসায় নির্যাতন। ৩২টি ঘটনায় হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি বা তদন্তাধীন ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক কলহ ও জমিজমা নিয়ে বিরোধের সঙ্গে হত্যার ঘটনা বেশি দেখা গেছে। শহরে কিছু ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্য স্থানেও।
শিশু যৌন নির্যাতনের বেশির ভাগ ঘটনাতেও পরিচিতরা জড়িত
২০২৫ সালে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ৩০৮টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে ‘শিশুরাই সব’। এর মধ্যে ধর্ষণ ১৯৭টি, ধর্ষণের চেষ্টা ৭৭টি, দলগত ধর্ষণ ২৪টি এবং ধর্ষণের পর হত্যা বা মৃত্যুর ঘটনা ছিল ১০টি।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু ছিল সবচেয়ে বেশি—১২৬ জন। ০ থেকে ৬ বছর বয়সী ছিল ৯৬ জন এবং ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ছিল ৮৬ জন।
যৌন নির্যাতনের ৫৯ দশমিক ০৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বাড়িতে। ২৭ দশমিক ৬০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বাইরে এবং ১৩ দশমিক ৩১ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
অভিযুক্তদের মধ্যে প্রতিবেশীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১২৫টি ঘটনায় প্রতিবেশীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে। ৬৬টি ঘটনায় পরিচিত ব্যক্তি, ৪৫টি ঘটনায় শিক্ষক বা ধর্মীয় শিক্ষক এবং ৪২টি ঘটনায় আত্মীয় জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে। অপরিচিত ব্যক্তি জড়িত ছিল ৩০টি ঘটনায়।
আলোচিত কয়েকটি হত্যার ঘটনা
শিশু হত্যার ভয়াবহতার সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে কুমিল্লার ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের ঘটনা। নিখোঁজ হওয়ার পর তার মৃত্যুর ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা ও নিখোঁজের পর দ্রুত উদ্ধারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০২৫ সালে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয়। ৫ মার্চ রাতে নিখোঁজ হওয়ার পর অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাকে। পরে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মার্চ তার মৃত্যু হয়। মামলাটিতে ১৭ মে রায় দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ১৩ জুলাই যাত্রাবাড়ীর একটি হোটেলে ১২ বছর বয়সী এক ছেলেশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। খাবার কিনে দেওয়ার কথা বলে তাকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে হোটেলে নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ৭ জুন অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেন।
বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ
‘শিশুরাই সব’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২৪ শিশু হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছিল ৩৫টিতে। ২৯টি ঘটনায় গ্রেপ্তার বা আটকের তথ্য পাওয়া গেছে। ৩২টি মামলা তদন্তাধীন ছিল। মাত্র দুটি ঘটনায় সাজার তথ্য পাওয়া যায়।
শিশুদের যৌন নির্যাতনের ৩০৮ ঘটনার মধ্যে ২৪৬টিতে মামলা বা গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে। ৪২টি মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল। তবে চূড়ান্ত সাজার তথ্য তুলনামূলকভাবে কম।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, নিখোঁজ শিশুকে শুধু উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়, তাকে জীবিত উদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি। কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার লাশ পাওয়া গেলে কীভাবে নিখোঁজ হয়েছিল, উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং কোনো অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
শিশু সুরক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুর্বলতা ও বিচারে বিলম্ব শিশুদের প্রতি সহিংসতা অব্যাহত রাখার অন্যতম কারণ।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, শিশুদের নিরাপত্তায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নিখোঁজের পর দ্রুত অনুসন্ধান, নির্যাতনের ঘটনায় কার্যকর তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারকেও আরও সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের চলাফেরা, অনলাইন যোগাযোগ ও পরিচিতজনদের সঙ্গে মেলামেশার বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।






















