মানবপাচার রোধে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা বেড়েছে, তবু ঘাটতি
- আপডেট সময় : ১২:৫১:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫২৫ বার পড়া হয়েছে
মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের সরকারের প্রচেষ্টা আগের তুলনায় বেড়েছে। নতুন আইন প্রণয়ন, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম জোরদার এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্তকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে মানব পাচার নির্মূলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। বিশেষ করে পাচারকারীদের দোষী সাব্যস্ত করা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন এবং দেশের অভ্যন্তরে মানব পাচার প্রতিরোধে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের মূল্যায়নকাল থেকে বাংলাদেশের সরকারের সামগ্রিক প্রচেষ্টা বেড়েছে। তবে মানব পাচার নির্মূলে ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ না হওয়ায় বাংলাদেশকে ‘টিয়ার ২’ শ্রেণিতেই রাখা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় ঘাটতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্তকরণে কিছু অগ্রগতি অর্জন করলেও শনাক্ত হওয়া ভুক্তভোগীর সংখ্যা এখনও কম। একই সঙ্গে তাদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা বেশি দেখা যায়।
মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অনেকেই সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকেন। ফলে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার পরও তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে তারা আবারও শোষণ ও পাচারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিদেশে চাকরির প্রলোভনে পাচারের ঝুঁকি
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। এ ছাড়া ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশি কর্মীরা যান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে অনেক অভিবাসী মধ্যস্থতাকারী ও বেসরকারি নিয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করেন। বৈধ নিয়োগ ফি ছাড়াও লাইসেন্সবিহীন সাব-এজেন্টদের বেআইনি ফি দিতে গিয়ে অনেক কর্মী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে এই ঋণকে হাতিয়ার করে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এতে ঋণভিত্তিক জবরদস্তি ও শ্রম শোষণের ঝুঁকি বাড়ে।
শ্রম শোষণের শিকার অভিবাসীরা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী বিদেশে প্রতারণামূলক নিয়োগচুক্তি, নির্ধারিত বেতন না পাওয়া, বেতন বকেয়া থাকা এবং কর্মঘণ্টা নিয়ে অনিয়মের মতো সমস্যার মুখোমুখি হন। পুরুষদের কৃষি ও নির্মাণ খাতে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করে শোষণের ঘটনাও রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশি নারী ও কিশোরীদের ভারত, পাকিস্তান এবং উপসাগরীয় দেশসহ বিভিন্ন স্থানে জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া নারীরা নানা ধরনের শোষণের ঝুঁকিতে থাকেন। নিয়োগের আগে কাজের প্রকৃতি, বেতন ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে সঠিক তথ্য না পাওয়া তাদের দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
অনলাইন চাকরির প্রলোভনে সাইবার অপরাধে বাধ্য
মানব পাচারের নতুন উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন জালিয়াতি ও সাইবার অপরাধে মানুষকে জোরপূর্বক যুক্ত করার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ ও অনলাইন চাকরির ওয়েবসাইটে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে নেওয়া হয়। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত পুরুষদের লক্ষ্য করে এ ধরনের প্রতারণা চালানো হয়।
বিদেশে পৌঁছানোর পর অনেকের পরিচয়পত্র ও বেতন আটকে রাখা হয়। পাশাপাশি চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং ঋণের বোঝা চাপিয়ে তাদের অনলাইন প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে বাধ্য করা হয়। ফলে প্রচলিত শ্রম ও যৌন পাচারের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর পাচারও নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
নিয়োগব্যবস্থায় সংস্কার ও জবাবদিহি জরুরি
মানব পাচার প্রতিরোধে সরকারের প্রচেষ্টা বাড়লেও কার্যকর ফল পেতে তদন্ত, বিচার এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নিয়োগ ফি নিয়ন্ত্রণ, মধ্যস্থতাকারীদের জবাবদিহি এবং প্রতারণামূলক চাকরির বিজ্ঞাপন বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অনলাইন চাকরির প্রস্তাব যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।
সব মিলিয়ে, মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের অগ্রগতি থাকলেও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, অপরাধীদের বিচার এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।





















