বাজারে সরকারের নজরদারি না থাকায় মানুষের ত্রাহি অবস্থা
- আপডেট সময় : ০৩:৫০:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪৪ বার পড়া হয়েছে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। সবজি, চাল, ডাল, ডিম, আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বাড়তি পরিবহন ব্যয়কে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখালেও ক্রেতাদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে।
এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। আয় বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিনই বাড়ছে সংসারের খরচ। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠছে।
এক সপ্তাহেই কয়েকটি সবজির দাম বেড়েছে ১০-২০ টাকা
রাজধানীর কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোল, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, ঝিঙা, ধুন্দল ও করলাসহ বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এক সপ্তাহ আগে ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া লম্বা বেগুন এখন বাজারভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ৫০ থেকে ৬০ টাকার পটোল ও ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে হয়েছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। করলা আগে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে।
ঝিঙা ও ধুন্দলসহ আরও কয়েকটি সবজির দামও কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা।
পরিবহন ব্যয়ের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা
যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা নঈম আহমেদ বলেন, পরিবহন খরচ বেড়েছে। একই সঙ্গে পাইকারি বাজারেও সবজির দাম বেড়েছে। বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বাড়ছে।
আরেক ব্যবসায়ী রায়হান আলী বলেন, মাদারীপুর থেকে যাত্রাবাড়ীতে বেগুন আসে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে মাঝারি ট্রাকের ভাড়া ছিল প্রায় ১৮ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২১ হাজার টাকা। এই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
তবে ক্রেতাদের প্রশ্ন, পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে প্রতি কেজি পণ্যের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু একসঙ্গে ১০ থেকে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা কতটা, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
আটা-ময়দার দামও বেড়েছে
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, নাখালপাড়া, মহাখালী, কলমিলতা কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজারে দেখা গেছে, প্যাকেটজাত আটা কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। ময়দার দাম ৮০ টাকা।
সপ্তাহখানেক আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা করে।
খোলা আটা ও ময়দার দামও পাঁচ-ছয় দিনের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ৫ টাকা করে বেড়েছে। বর্তমানে খোলা আটা ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, এক-দেড় মাস আগে আটা-ময়দার দাম বাড়ার পর আবারও নতুন করে দাম বেড়েছে। কোম্পানিগুলো নতুন প্যাকেটজাত পণ্যের খুচরা মূল্যও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চালের দামেও বাড়তি চাপের আশঙ্কা
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট থেকে চাল এনে মহাখালী কাঁচাবাজারে বিক্রি করা এক ব্যবসায়ী জানান, আগে কৃষি মার্কেট থেকে ছোট পিকআপে পণ্য আনতে প্রায় দেড় হাজার টাকা ভাড়া লাগত। এখন সেখানে আরও প্রায় ২০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
তার মতে, বাড়তি পরিবহন খরচ চালের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে। পাশাপাশি ডিজেলের দাম বাড়ায় মিলারদের চাল প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও বাড়তে পারে। ফলে কয়েক দিনের মধ্যে চালের বাজারেও নতুন করে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজারে নজরদারির দাবি ভোক্তা অধিকারকর্মীদের
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। যেখানে দুই টাকা দাম বাড়ার কথা, সেখানে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় শিল্প-কারখানা, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব ভোক্তার ওপর পড়ছে। তবে কোন পণ্যের দাম পরিবহন ব্যয়ের কারণে কতটা বাড়ার কথা, তার সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি।
সরকারের বক্তব্য
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে দেওয়া হবে না। সরবরাহব্যবস্থায় কোথাও অসঙ্গতি তৈরি হলে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে বাস্তব বাজারচিত্রে সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও চালের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও সবজির বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বস্তি চান সাধারণ মানুষ
ভোক্তাদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব কতটা এবং এর সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা কতটা অতিরিক্ত দাম বাড়াচ্ছেন, তা তদারকির মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর নজরদারি না থাকলে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাই বাজারে নিয়মিত তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।


























