ইসরাইলে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করলেন প্রেসিডেন্ট
- আপডেট সময় : ০১:৫০:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৩১ বার পড়া হয়েছে
ইসরাইলে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফলকে আইনগতভাবে বৈধ ঘোষণা করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন তিনি। এর ফলে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী শিবির এবং ফিলিস্তিনি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। ফলে নতুন সরকার গঠনে রাজনৈতিক সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। কোন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করতেই এই পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এক বিবৃতিতে হারজগ বলেন, ‘নির্বাচন শেষ হয়েছে। এখন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়।’ তার এই বক্তব্যকে নেতানিয়াহুর নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রচেষ্টার বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের প্রমাণ পায়নি কমিশন
ইসরাইলের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হয়েছে কিংবা ফলাফলে প্রভাব পড়েছে, এমন কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বুধবার কমিশন জানায়, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ ছড়ানো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর। এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও দলটি কোনো সাড়া দেয়নি।
এদিকে নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে পৃথক তদন্ত চালাচ্ছে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত। সংস্থাটির প্রধান ডেভিড জিনি নেতানিয়াহুর নিয়োগ করা কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
বুধবার নির্বাচন কমিটির এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে শিন বেতের একটি গোয়েন্দা মূল্যায়ন তুলে ধরেন কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ। সেখানে দাবি করা হয়, ইসরাইলের ভেতরে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। এসব দেশের মধ্যে ইসরাইলের শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে এই দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেনি শিন বেত। বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তির কাছ থেকে মূল্যায়নের প্রতিলিপি সংগ্রহ করেছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ গুরুতর হলেও এর কোনো প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।
বিচারপতি সোলবার্গও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই পর্যায়ে এগুলো কেবল সন্দেহমাত্র। আর এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সম্ভাব্য প্রভাবের পরিধি সীমিত।’
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের ফলাফল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট করা সহজ, কিন্তু তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
জোট সরকার গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধীদলীয় নেতা গাদি আইজেনকোটের মিত্ররা কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
ফলে নতুন সরকার গঠনে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আইজেনকোটের সঙ্গে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জোট গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
বুধবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক শুরু করেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। প্রথম দিন নেতানিয়াহুর ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি দল তাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সাবেক মিত্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা এক নেতার নেতৃত্বাধীন চতুর্থ দল বিরোধীদলীয় নেতা আইজেনকোটের নাম সুপারিশ করেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দলসহ আরও আটটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে প্রেসিডেন্টের। আলোচনার শেষ পর্যায়ে বৈঠক করবে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি এবং নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি।
সব দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে হারজগ এমন একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোটের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নিতে পারেন তিনি।
প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত ঘোষণার জন্য কয়েক দিন সময় রয়েছে। এরপর সরকার গঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে জোট আলোচনা চলবে। তবে কোনো পক্ষই সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে আগামী বছরের শুরুতে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
আরব আইনপ্রণেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন নাকচ
নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে তদন্তের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) কয়েকজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চেয়েছিল শিন বেত।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাদের জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনা ছিল, তাদের মধ্যে রা’আম পার্টির নেতা মনসুর আব্বাসসহ আরব সম্প্রদায়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা রয়েছেন।
তবে শিন বেতের এই আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারা।
তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের যৌক্তিকতা প্রমাণের মতো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কোনো নাগরিক কিংবা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে আরব দলগুলোর যৌথ রাজনৈতিক জোট জয়েন্ট লিস্ট শিন বেতের এই উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, আরব ভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা পরিকল্পিতভাবে উসকানিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছেন।
নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি মিত্র ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির শিন বেতের প্রতি আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরব রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের গ্রেপ্তার করার দাবি জানান। এমনকি সন্দেহের বিষয়গুলো পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাদের আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের কথাও বলেন।
তবে শিন বেতের ওপর তার এ বিষয়ে সরাসরি কোনো কর্তৃত্ব নেই।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট হারজগ জানিয়েছেন, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত চলতে পারে। তবে ইসরাইলি আরব ভোটারদের যেন কোনোভাবেই সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে আরব সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে দেওয়া বিভিন্ন ‘অশালীন ও বর্ণবাদী বক্তব্যের’ নিন্দাও জানিয়েছেন হারজগ।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে ইসরাইলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। নতুন সরকার গঠনে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত এবং দলগুলোর মধ্যে জোট আলোচনা দেশটির আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তথ্যসূত্র: পিবিএস




















