০২:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

স্বাচিপ সিন্ডিকেটে তছনছ ড্যাব!

শাহীন আবদুল বারী
  • আপডেট সময় : ১২:২৬:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৫৫৪ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টাঙ্গাইল জেলার চল্লিশ লাখ মানুষের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা যেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচিপের হাতে বন্দি। সিভিল সার্জনের কার্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ সকল সরকারি হাসপাতালে আওয়ামীপন্থী পেশাজীবী সংগঠন স্বাচিপের আধিপত্য ও প্রভাব বিদ্যমান।

ড্যাবসহ মেধাবী চিকিৎসকরা কোনঠাসা

অপরদিকে পতিত সরকারের দীর্ঘ সময়ে দৌড়ের ওপর থাকা ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবসহ মেধাবী চিকিৎসকরা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়নের আশায় দিন কাটছে তাদের। এছাড়া স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এমএসআর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নিয়ে তোলপাড়

সম্প্রতি ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৫ বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নদীতে ফেলে দেওয়ার সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে। গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে এ নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়। নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ওষুধকাণ্ডের ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা স্বাচিপ সদস্য আবু নয়িম মোহাম্মদ সোহেলকে ওএসডি করা হয়। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। স্বাচিপের আধিপত্য বিস্তারের কারণে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চিকিৎসকদের পদায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে। আওয়ামী শাসনামলের প্রায় ১৭ বছর এসব হাসপাতালের চিকিৎসক নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে স্বাচিপের সদস্যই ছিল যোগ্যতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি। এ সময় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে বিএনপি-জামায়াতপন্থী চিকিৎসকরা ছিলেন অনেকটা দৌড়ের ওপর। পতিত সরকার বিদায় নেওয়ার পর এখনো হাসপাতালগুলোতে স্বাচিপের জয়জয়কার।

সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিত্র

অনুসন্ধানে জানা যায়, টাঙ্গাইলের বর্তমান সিভিল সার্জন স্বাচিপের আজীবন সদস্য ফরাজী মোঃ মাহবুবুল আলম মঞ্জু গত বছরের ৯ মার্চ যোগদান করেন। স্বাচিপের অপর দুই সদস্য ডেপুটি সিভিল সার্জন মুহাম্মদ আজিজুল হক এবং মেডিকেল অফিসার (জেলা কো-অর্ডিনেটর) আবু জাফর যোগদান করেন আওয়ামী সরকারের সময়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক পদে স্বাচিপের দুই সদস্য কামরুল কিবরিয়া ও মারুফ আহমেদ খান সহকারী পরিচালক পদে যোগদান করেন। এর আগে ২০১৪ সালে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক পদে যোগদান করেন স্বাচিপের আজীবন সদস্য নুরুল আলম মিঞা। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। এ সময় তার বিরুদ্ধে অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং জনবল নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত তিনি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ পদে বহাল ছিলেন। বর্তমানে হাসপাতালের মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান। মেডিকেল ও হাসপাতালে ১১৭ জন চিকিৎসকের বেশির ভাগই স্বাচিপের সদস্য।

গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বাচিপ সদস্য থাকার অভিযোগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ৪৮ জন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা প্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী চিকিৎসক সমাজ। জুলাই গণবিপ্লবের বিরোধিতা, গণহত্যায় মদদদাতার অভিযোগ আনা হয়। এ তালিকার কয়েকজন বদলি হলেও বাকিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। জেলার ১২ উপজেলার মধ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে নয়জন নিয়োগ পান আওয়ামী সরকার আমলে। যাদের প্রায় সকলেই স্বাচিপ সদস্য বা আওয়ামী সুবিধাভোগী। ৫ আগস্টের পর যোগদান করা তিনজনের মধ্যে স্বাচিপের সদস্য একজন।

ড্যাবের বক্তব্য

ড্যাবের টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি ডা. আব্দুল মতিন মিডিয়াকে জানান, জেলার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্র এখনো স্বাচিপ ও আওয়ামী সুবিধাভোগী চিকিৎসকদের দখলে। নানা অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে আগের মতোই। শূন্যপদে আওয়ামী দুঃশাসনে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও পদায়নের সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে আনা হয়েছে একাধিকবার। এছাড়া ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা স্বাচিপ সদস্য আবু নয়িমকে আগেই সরিয়ে দিলে ওষুধ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটত না বলে জানান ড্যাবের নেতারা। ড্যাবের একাধিক সদস্যের অভিযোগ, বিএনপির একটি চক্রের ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা লাভের কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে মির্জাপুর, দেলদুয়ার, নাগরপুর, ভূঞাপুর, গোপালপুর, ধনবাড়ি ও সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (এমএসআর) মেডিকেল, সার্জিক্যাল অ্যান্ড রিকুইজিট টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব উপজেলা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার (পিপিআর) বহির্ভূত শর্ত আরোপ করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে।

টেন্ডার নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, সম্প্রতি দেলদুয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেন্ডারে ১১টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী চারটি প্রতিষ্ঠান নমুনা জমা দেয়। বাকি প্রতিষ্ঠান নমুনা দেয়নি। এছাড়াও সরকার নির্ধারিত ওষুধের দরের চেয়ে অতিরিক্ত দরে প্রতিষ্ঠানকে কাজের চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখেছে। নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার আগেই দরদাতাদের অনেকের বিডি ফেরত দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো উপজেলায় পিপিআর-বহির্ভূত ই-ট্রেড লাইসেন্স চাওয়া হয়েছে। অথচ টাঙ্গাইল জেলায় এখনো পর্যন্ত ই-ট্রেড লাইসেন্স সেবা চালু হয়নি। ফলে বৃহৎ এ জেলায় ঠিকাদারদের বড় একটি অংশ টেন্ডারে অংশ নিতে পারেনি। এছাড়াও অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টেন্ডারে চেম্বার অব কমার্সের কিউআর কোড, ডিপিএম কর্তৃক ঠিকাদারের অডিট রিপোর্ট, পৌরসভার প্রত্যয়নপত্র, এমনকি ঠিকাদারের জন্মসনদপত্রের শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

ই-ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, ই-ট্রেড লাইসেন্সের কারণে তারা টেন্ডারে অংশ নিতে পারেননি। তবে পিপিআর-বহির্ভূত শর্ত আরোপসহ সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন দেলদুয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাজিয়া আফরিন।

পদ শূন্য, চিকিৎসক সংকটও রয়েছে

জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুমোদিত ৪৫০টি পদের মধ্যে শূন্যপদ ১৭৭টি। পদায়নকৃত ২৭৩ জনের মধ্যে বেশির ভাগই আওয়ামীপন্থী সুবিধাভোগী। এছাড়া ৫ আগস্টের পরে যে ১৪৫ জনের পদায়ন হয়, তার মধ্যেও প্রাধান্য পায় আওয়ামী সুবিধাভোগীরা।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭৯০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৬৩ জন আর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৮৭ জনের বিপরীতে ৫৪ জন চিকিৎসক রয়েছে। এছাড়া জেলায় ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসকদের অধিকাংশ আওয়ামী পরিবারের সদস্য বা সুবিধাভোগী।

সিভিল সার্জনের বক্তব্য

জেলা সিভিল সার্জন ফরাজী মোঃ মাহবুবুল আলম মঞ্জু মিডিয়াকে জানান, ঘাটাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধকাণ্ডের ঘটনায় কর্মকর্তাকে ওএসডি এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলার টেন্ডারে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তিনি স্বাচিপের সদস্য নন বলেও দাবি করেন।

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

স্বাচিপ সিন্ডিকেটে তছনছ ড্যাব!

আপডেট সময় : ১২:২৬:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

টাঙ্গাইল জেলার চল্লিশ লাখ মানুষের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা যেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচিপের হাতে বন্দি। সিভিল সার্জনের কার্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ সকল সরকারি হাসপাতালে আওয়ামীপন্থী পেশাজীবী সংগঠন স্বাচিপের আধিপত্য ও প্রভাব বিদ্যমান।

ড্যাবসহ মেধাবী চিকিৎসকরা কোনঠাসা

অপরদিকে পতিত সরকারের দীর্ঘ সময়ে দৌড়ের ওপর থাকা ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবসহ মেধাবী চিকিৎসকরা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়নের আশায় দিন কাটছে তাদের। এছাড়া স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এমএসআর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নিয়ে তোলপাড়

সম্প্রতি ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৫ বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নদীতে ফেলে দেওয়ার সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে। গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে এ নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়। নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ওষুধকাণ্ডের ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা স্বাচিপ সদস্য আবু নয়িম মোহাম্মদ সোহেলকে ওএসডি করা হয়। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। স্বাচিপের আধিপত্য বিস্তারের কারণে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চিকিৎসকদের পদায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে। আওয়ামী শাসনামলের প্রায় ১৭ বছর এসব হাসপাতালের চিকিৎসক নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে স্বাচিপের সদস্যই ছিল যোগ্যতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি। এ সময় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে বিএনপি-জামায়াতপন্থী চিকিৎসকরা ছিলেন অনেকটা দৌড়ের ওপর। পতিত সরকার বিদায় নেওয়ার পর এখনো হাসপাতালগুলোতে স্বাচিপের জয়জয়কার।

সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিত্র

অনুসন্ধানে জানা যায়, টাঙ্গাইলের বর্তমান সিভিল সার্জন স্বাচিপের আজীবন সদস্য ফরাজী মোঃ মাহবুবুল আলম মঞ্জু গত বছরের ৯ মার্চ যোগদান করেন। স্বাচিপের অপর দুই সদস্য ডেপুটি সিভিল সার্জন মুহাম্মদ আজিজুল হক এবং মেডিকেল অফিসার (জেলা কো-অর্ডিনেটর) আবু জাফর যোগদান করেন আওয়ামী সরকারের সময়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক পদে স্বাচিপের দুই সদস্য কামরুল কিবরিয়া ও মারুফ আহমেদ খান সহকারী পরিচালক পদে যোগদান করেন। এর আগে ২০১৪ সালে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক পদে যোগদান করেন স্বাচিপের আজীবন সদস্য নুরুল আলম মিঞা। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। এ সময় তার বিরুদ্ধে অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং জনবল নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত তিনি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ পদে বহাল ছিলেন। বর্তমানে হাসপাতালের মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান। মেডিকেল ও হাসপাতালে ১১৭ জন চিকিৎসকের বেশির ভাগই স্বাচিপের সদস্য।

গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বাচিপ সদস্য থাকার অভিযোগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ৪৮ জন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা প্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী চিকিৎসক সমাজ। জুলাই গণবিপ্লবের বিরোধিতা, গণহত্যায় মদদদাতার অভিযোগ আনা হয়। এ তালিকার কয়েকজন বদলি হলেও বাকিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। জেলার ১২ উপজেলার মধ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে নয়জন নিয়োগ পান আওয়ামী সরকার আমলে। যাদের প্রায় সকলেই স্বাচিপ সদস্য বা আওয়ামী সুবিধাভোগী। ৫ আগস্টের পর যোগদান করা তিনজনের মধ্যে স্বাচিপের সদস্য একজন।

ড্যাবের বক্তব্য

ড্যাবের টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি ডা. আব্দুল মতিন মিডিয়াকে জানান, জেলার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্র এখনো স্বাচিপ ও আওয়ামী সুবিধাভোগী চিকিৎসকদের দখলে। নানা অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে আগের মতোই। শূন্যপদে আওয়ামী দুঃশাসনে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও পদায়নের সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে আনা হয়েছে একাধিকবার। এছাড়া ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা স্বাচিপ সদস্য আবু নয়িমকে আগেই সরিয়ে দিলে ওষুধ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটত না বলে জানান ড্যাবের নেতারা। ড্যাবের একাধিক সদস্যের অভিযোগ, বিএনপির একটি চক্রের ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা লাভের কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে মির্জাপুর, দেলদুয়ার, নাগরপুর, ভূঞাপুর, গোপালপুর, ধনবাড়ি ও সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (এমএসআর) মেডিকেল, সার্জিক্যাল অ্যান্ড রিকুইজিট টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব উপজেলা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার (পিপিআর) বহির্ভূত শর্ত আরোপ করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে।

টেন্ডার নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, সম্প্রতি দেলদুয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেন্ডারে ১১টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী চারটি প্রতিষ্ঠান নমুনা জমা দেয়। বাকি প্রতিষ্ঠান নমুনা দেয়নি। এছাড়াও সরকার নির্ধারিত ওষুধের দরের চেয়ে অতিরিক্ত দরে প্রতিষ্ঠানকে কাজের চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখেছে। নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার আগেই দরদাতাদের অনেকের বিডি ফেরত দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো উপজেলায় পিপিআর-বহির্ভূত ই-ট্রেড লাইসেন্স চাওয়া হয়েছে। অথচ টাঙ্গাইল জেলায় এখনো পর্যন্ত ই-ট্রেড লাইসেন্স সেবা চালু হয়নি। ফলে বৃহৎ এ জেলায় ঠিকাদারদের বড় একটি অংশ টেন্ডারে অংশ নিতে পারেনি। এছাড়াও অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টেন্ডারে চেম্বার অব কমার্সের কিউআর কোড, ডিপিএম কর্তৃক ঠিকাদারের অডিট রিপোর্ট, পৌরসভার প্রত্যয়নপত্র, এমনকি ঠিকাদারের জন্মসনদপত্রের শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

ই-ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, ই-ট্রেড লাইসেন্সের কারণে তারা টেন্ডারে অংশ নিতে পারেননি। তবে পিপিআর-বহির্ভূত শর্ত আরোপসহ সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন দেলদুয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাজিয়া আফরিন।

পদ শূন্য, চিকিৎসক সংকটও রয়েছে

জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুমোদিত ৪৫০টি পদের মধ্যে শূন্যপদ ১৭৭টি। পদায়নকৃত ২৭৩ জনের মধ্যে বেশির ভাগই আওয়ামীপন্থী সুবিধাভোগী। এছাড়া ৫ আগস্টের পরে যে ১৪৫ জনের পদায়ন হয়, তার মধ্যেও প্রাধান্য পায় আওয়ামী সুবিধাভোগীরা।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭৯০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৬৩ জন আর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৮৭ জনের বিপরীতে ৫৪ জন চিকিৎসক রয়েছে। এছাড়া জেলায় ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসকদের অধিকাংশ আওয়ামী পরিবারের সদস্য বা সুবিধাভোগী।

সিভিল সার্জনের বক্তব্য

জেলা সিভিল সার্জন ফরাজী মোঃ মাহবুবুল আলম মঞ্জু মিডিয়াকে জানান, ঘাটাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধকাণ্ডের ঘটনায় কর্মকর্তাকে ওএসডি এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলার টেন্ডারে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তিনি স্বাচিপের সদস্য নন বলেও দাবি করেন।