সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে মহাপরিকল্পনা সরকারের
- আপডেট সময় : ০১:১৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪৬ বার পড়া হয়েছে
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে দেশব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারের ভবনের ছাদেও সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তাই দেশীয়ভাবে সহজলভ্য সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ
বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
তিনি জানান, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রুফটপ সোলারে গুরুত্ব
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা গেলে অতিরিক্ত জমি ব্যবহার ছাড়াই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
২০২৫ সালে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য স্থাপনার ছাদ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই কর্মসূচির আওতায় দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নেট মিটারিং সুবিধা আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে গ্রাহকদেরও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ভবনেই উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহারের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াট করার লক্ষ্য
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গত মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা বর্তমানে ১ হাজার ৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর বাইরে গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত নয় এমন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা ৩৭৭ দশমিক ১৭ মেগাওয়াট।
সব মিলিয়ে দেশে সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬৭ মেগাওয়াট। আগামী পাঁচ বছরে এই সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাড়বে বেসরকারি বিনিয়োগ
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নির্ভরযোগ্যভাবে যুক্ত করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, নীতিগত সুবিধা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
ব্যাটারি স্টোরেজ ও আধুনিক গ্রিডের প্রয়োজন
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সূর্যের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে দিনের বিভিন্ন সময়ে উৎপাদনের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়।
এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দিনের বেলায় অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে সন্ধ্যা বা রাতে ব্যবহার করা গেলে সৌরবিদ্যুতের কার্যকারিতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন, বড় পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
জমির সংকটেও সমাধান রুফটপ সোলার
বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিজমি রক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। তাই পতিত ও অনুপযোগী জমি, বিভিন্ন স্থাপনার ছাদ এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে জলাশয়ভিত্তিক বা ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেচ পাম্প, ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, কোল্ড স্টোরেজ, হাঁস-মুরগি ও মাছের খামারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের বিকল্প উৎস তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি রুফটপ সোলার, নেট মিটারিং, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ই নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




















