রোহিঙ্গাদের জমি দখল করে বন্দিশিবির-সামরিক ঘাঁটি বানাচ্ছে আরাকান আর্মি
- আপডেট সময় : ০৪:৩৭:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬৮ বার পড়া হয়েছে
মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের পরিত্যক্ত জমি দখল করে বন্দিশিবির, সামরিক ব্যারাক ও নতুন বসতি নির্মাণ করছে আরাকান আর্মি (এএ)। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক অনুসন্ধানে স্যাটেলাইট চিত্র, জাতিসংঘের গবেষণা এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাখাইনের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর রোহিঙ্গাদের গ্রাম ধ্বংস এবং তাদের জমি দখলের ঘটনা বেড়েছে। উত্তর রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অন্তত ১০টি শিবির নির্মাণের তথ্য পেয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।
রোহিঙ্গাদের কৃষিজমিতে বন্দিশিবির
বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন বুথিডং টাউনশিপের হ্নগেট থায় এলাকায় এমন একটি শিবিরের সন্ধান পেয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ওই এলাকায় রোহিঙ্গারা ধান চাষ করতেন। কিন্তু ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে প্রায় ১২০টি ধূসর রঙের ভবন দেখা গেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব স্থাপনা আরাকান আর্মি পরিচালিত বন্দিশিবিরের অংশ। সেখানে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে রাখা হয়েছে। তাদের অনুমতি ছাড়া শিবিরের বাইরে যাওয়া কিংবা সেখানে প্রবেশের সুযোগ নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৮০০ হেক্টর জমি দখলের অভিযোগ
জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের অন্তত ৮০০ হেক্টর জমি দখল করে সেখানে শিবির, বসতি ও সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
একই সময়ে রোহিঙ্গাদের জমি দখল এবং তাদের বাস্তুচ্যুত করার অন্তত ২৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘ।
রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, তাদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলার পাশাপাশি বাড়ির কাঠ ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে আরাকান আর্মির স্থাপনা নির্মাণে বাধ্য করা হয়েছে। ওয়েত নিয়ো তাউং এলাকায় ‘এপি ব্যাটালিয়ন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক ব্যারাক নির্মাণের তথ্যও উঠে এসেছে।
জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদিকের অভিযোগ, তাদের কৃষিজমি ও ফলের বাগান পরিষ্কার করে সেখানে নতুন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। অন্য এক রোহিঙ্গা জানান, তাদের দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার, পরিখা খনন এবং শিবিরের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের কায়িক শ্রম করানো হতো।
এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক শ্রম, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং কর আদায়ের অভিযোগও রয়েছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে আরাকান আর্মি। তাদের দাবি, তারা শুধু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।
‘মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা তৈরি’ করার অভিযোগ
জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার পরিকল্পনাকারীদের লক্ষ্য ছিল ‘মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা তৈরি করা’।
তবে রোহিঙ্গাদের জমি ধ্বংস ও দখলের জন্য আরাকান আর্মিই সরাসরি দায়ী—এমন তথ্য এখনো জাতিসংঘের তদন্তে নিশ্চিত হয়নি বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক টম ড্যানেনবামের মতে, রোহিঙ্গাদের ওপর জবরদস্তি এবং তাদের নিজ এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করার সমন্বিত কর্মকাণ্ড ‘জনসংখ্যা স্থানান্তর’-সংক্রান্ত যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
এদিকে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা চলছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হয়েছিল কি না, সেই অভিযোগের বিষয়ে চলতি মাসেই আদালতের রায় দেওয়ার কথা রয়েছে।






















