মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশন, তবু বেঁচে গেলেন ক্রিস্টা পাইক
- আপডেট সময় : ১২:২৪:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫২ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুই দফা চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর জ্ঞান ফিরেছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইকের। হাসপাতালের বিছানায় জেগে উঠে তিনি কথা বলতে শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। তবে দীর্ঘমেয়াদে তার শারীরিক অবস্থার ওপর এই ঘটনার কী প্রভাব পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। চিকিৎসকদের ধারণা, পুরোপুরি সুস্থ হতে তার দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
দুই ডোজ পেন্টোবার্বিটাল দিয়েও মৃত্যু হয়নি
গত ৩০ সেপ্টেম্বর টেনেসিতে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি দেয়। এরপর তাকে পেন্টোবার্বিটাল নামের ওষুধের দুটি ডোজ দেওয়া হয়।
তবে দুই ডোজ দেওয়ার পরও তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়নি। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক দিন তিনি অচেতন ছিলেন এবং ইন্টুবেট করে ভেন্টিলেটরের সহায়তায় রাখা হয়।
সাতটি সূঁচ ব্যবহারের দাবি
পাইকের আইনজীবীদের ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তার শরীরে অন্তত সাতটি সূঁচ ব্যবহার করে আইভি লাইন স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। তাদের দাবি, দুই ডোজ ওষুধ দেওয়ার সময় পাইককে কাঁদতে, গোঙাতে এবং জোরে শ্বাস নিতে শোনা যায়।
আদালতে দাখিল করা নথিতে আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দলের সদস্যরা বুঝতে পারেননি যে আইভি লাইনগুলো সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়নি। শিরা ফেটে যাওয়ার কারণে পেন্টোবার্বিটাল পুরোপুরি বা আংশিকভাবে তার রক্তপ্রবাহে প্রবেশ না করার সম্ভাবনাও তারা তুলে ধরেছেন।
আগে থেকেই ঝুঁকির কথা জানিয়েছিলেন আইনজীবীরা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাইকের আইনজীবীরা টেনেসির প্রাণঘাতী ইনজেকশন পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছিলেন। সেখানে তারা জানিয়েছিলেন, পাইক থ্রম্বোসাইটোসিস নামের রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যায় ভুগছিলেন। তার শিরা ছোট হওয়ায় ইনজেকশন দেওয়ার সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল বলেন, পাইকের ক্ষেত্রে আইভি লাইন স্থাপন করা সাধারণ রক্ত সংগ্রহের চেয়ে বেশি কঠিন ছিল। অন্য আইনজীবী র্যান্ডি স্পিভির দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইকের ডান হাত বেগুনি হয়ে যেতে দেখা যায় এবং পরে ইনজেকশনের স্থানগুলোর আশপাশে জ্বালাপোড়া দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের চোখে অস্বাভাবিক ঘটনা
ফোর্ডহ্যাম ল স্কুলের অপরাধবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো পাইকের জ্ঞান ফিরে পাওয়া এবং কথা বলতে পারাকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এর আগে আরও কয়েকজন বন্দি নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে গেছেন। তবে সেসব ক্ষেত্রে বন্দিদের শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি।
পাইকের ঘটনা আলাদা। কারণ তার শরীরে প্রাণঘাতী পদার্থ ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়ার পরও তিনি বেঁচে গেছেন।
শরীরে পর্যাপ্ত ওষুধ পৌঁছায়নি?
পাইকের আইনি দলের পরামর্শক অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডক্টর জোয়েল জিভোটের মতে, পেন্টোবার্বিটালের দুই ডোজ স্বাভাবিকভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করলে তার নিশ্চিতভাবে মারা যাওয়ার কথা ছিল।
তার ধারণা, পাইকের রক্তে পেন্টোবার্বিটালের মাত্রা মৃত্যু ঘটানোর মতো পর্যাপ্ত ছিল না। ইনজেকশনের পর বাহুতে ফোস্কা দেখা দেওয়াও শিরা ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত হতে পারে।
জিভোটের মতে, পেন্টোবার্বিটাল রক্তপ্রবাহে না গিয়ে সম্ভবত ত্বকের নিচের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাইকের রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যাও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে স্থগিতাদেশ
ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর বিল লি রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। বছরের বাকি সময়ের জন্য রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনের কমিশনার ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডা পদত্যাগ করছেন।
তবে ক্রিস্টা পাইককে আবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চেষ্টা করা হবে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। দুই ডোজ পেন্টোবার্বিটাল দেওয়ার পরও কেন তার মৃত্যু হয়নি, তারও কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
১৯৯৫ সালে হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত
বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইক ১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন। ১৯৯৬ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের সঙ্গে মিলে তিনি হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন।
স্লেমারকে সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের একটি ক্যাম্পে হত্যা করা হয়। পরে ক্যাম্পের আরও দুজন বাসিন্দা সাক্ষ্য দেন, পাইক হত্যাকাণ্ড নিয়ে বড়াই করেছিলেন এবং তাদের স্লেমারের মাথার খুলির একটি টুকরো দেখিয়েছিলেন।
এই মামলায় ট্যাডারিল শিপকে প্যারোলের সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকা থাকলেও সে সময় আইনত প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি।
এখন কী হবে ক্রিস্টা পাইকের?
ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ক্রিস্টা পাইকের সাজা কমানোর আবেদন করেছেন তার আইনজীবীরা। রাজ্য আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করবে কি না, সেটিও এখনো অনিশ্চিত।
এদিকে তার শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধের কী প্রভাব পড়েছে এবং তিনি কতটা সুস্থ হয়ে উঠবেন, তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। চিকিৎসক জিভোটের মতে, পেন্টোবার্বিটালের মাত্রা কমতে এবং পূর্ণাঙ্গ স্নায়বিক পরীক্ষা করা সম্ভব হতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তাই ক্রিস্টা পাইকের ক্ষেত্রে এখন একদিকে যেমন ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি পরিণতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে তার শারীরিক ও স্নায়বিক অবস্থাও পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।





















