মিডটার্মে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়, পেছনে পাঁচ কারণ
- আপডেট সময় : ০২:৫৮:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৫৯ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের দখলে নিয়েছে দলটি। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে হয়েছে। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কিছুটা আসন হারায়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবিকে ট্রাম্প প্রশাসনের দুই বছরের শাসনের বিরুদ্ধে ভোটারদের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ, ডেমোক্র্যাটদের কার্যকর নির্বাচনী প্রচারণা, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন হারানো রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশ্লেষণে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে পাঁচটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
১. জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপ
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের অন্যতম বড় কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সাধারণ মানুষ খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের বাড়তি দামের কারণে চাপে রয়েছেন।
নির্বাচনের আগে নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বিবিসিকে জানান, গ্যাস ও মুদি পণ্যসহ প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। এ কারণে তিনি রিপাবলিকানদের পরিবর্তে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে বিভিন্ন পণ্যের দাম ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
ভোটারদের ওপর পরিচালিত জরিপেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে তাঁরা নিজেরা বা তাঁদের পরিবার মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
এ ছাড়া ৬০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতির কারণেই পণ্যের দাম স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বেড়েছে। ফলে অর্থনৈতিক অসন্তোষ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
২. ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ
রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর। পেট্রোল পাম্পে বাড়তি দাম গুনতে হয় গাড়িচালকদের।
শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাবও পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেছিলেন। একই সঙ্গে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধিতাও করেছিলেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে তাঁর সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একটি জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। অন্যদিকে, ৭৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্পও পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া তাঁর সামনে অন্য কোনো পথ ছিল না।
৩. ডেমোক্র্যাটদের পরিকল্পিত ও কার্যকর প্রচারণা
রিপাবলিকানদের বিপরীতে ডেমোক্র্যাটরা এবারের নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত প্রচারণা চালিয়েছে। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও তাঁরা শক্তিশালী প্রার্থী দাঁড় করাতে সক্ষম হন।
ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং দুর্নীতি মোকাবিলার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন। তাঁরা ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে যুক্ত করতে পেরেছেন।
টেক্সাসে সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং কানসাসে যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন নিজেদের বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেন।
সাউথ ক্যারোলাইনায় অপ্রত্যাশিত জয় পান ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুস। সাবেক এই শিশু বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করেন।
অন্যদিকে, মিশিগানে সিনেটর নির্বাচিত হয়ে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে রাখেন সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল-সায়েদ। তাঁর প্রচারণার মূল বক্তব্য ছিল, রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব কমিয়ে সাধারণ মানুষের পকেটে অর্থ ফেরানো।
জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত হন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন অসফ। জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালিয়ে তিনি সহজ জয় পান। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয় পাওয়া এই অঙ্গরাজ্যে অসফের সাফল্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের কয়েকজন প্রার্থী ভোটারদের প্রকৃত উদ্বেগ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে সমালোচনা হয়েছে। টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো প্রার্থীদের প্রচারণায় দুর্বলতা ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
৪. ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস।
মূল্যস্ফীতি ও ইরান যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ভোটারদের অসন্তোষের দায়ও তাঁর ওপর পড়েছে।
এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন করা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা ঝুঁকির মুখে পড়েন।
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প নিজেকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি ভোটারদের কল্পনা করতে বলেন, ব্যালটে যেন তাঁর নামই রয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ট্রাম্পের পরিচিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব এবার আগের মতো কাজে আসেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বরং রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারণায় ট্রাম্পকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ছিল মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়। কিন্তু ট্রাম্পের নির্বাচনী বক্তব্যে এসব বিষয়ে প্রত্যাশিত গুরুত্ব না পাওয়ায় অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটন ডিসিতে দেওয়া শেষ নির্বাচনী ভাষণেও ট্রাম্প অর্থনৈতিক সংকটের পরিবর্তে নিজের বিতর্কিত রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এতে ভোটারদের অগ্রাধিকারের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন হারানো
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কিছু হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের সমর্থন পেয়েছিলেন ট্রাম্প। এই ভোটের একটি অংশ তাঁর নির্বাচনী জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সমর্থনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।
টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক অধ্যুষিত কংগ্রেসীয় আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের তিনটি আসনেই জয় পেয়েছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের ভোটের হার ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। দেশটির প্রধান জনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই পরিবর্তন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।
অভিবাসন নীতি নিয়ে অসন্তোষও ভোটারদের অবস্থান পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিইর কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশ আমেরিকান আইসিই সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।
একইভাবে কৃষ্ণাঙ্গ-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতেও ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের সমর্থন বেড়েছে। মিসিসিপির সিনেট নির্বাচনেও এই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা গেছে। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের হার প্রায় ৩৭ শতাংশ। স্কট কলোম জয়ী হলে ১৯৮২ সালের পর তিনিই হবেন রাজ্যটি থেকে সিনেটে নির্বাচিত প্রথম ডেমোক্র্যাট।
রিপাবলিকানদের জন্য কী বার্তা দিল এই পরাজয়?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয় শুধু কয়েকটি আসন হারানোর ঘটনা নয়। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষেরও প্রতিফলন।
বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধনীতি ও অভিবাসন ইস্যুতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় রিপাবলিকানদের সমর্থন কমেছে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সামনে এনে নির্বাচনী প্রচারণায় সুবিধা পেয়েছে।
এই ফলাফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। একই সঙ্গে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই দলের কৌশল নির্ধারণেও এবারের ফল বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
























