মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়: প্রতিমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ০৩:১৬:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৬৪ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সরকার অনেকটা বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় ছাড়া সরকারের সামনে কার্যত আর কোনো বিকল্প ছিল না।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে জাহাজ ভাড়া ও বীমা প্রিমিয়ামও বেড়েছে। ফলে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তিনি জানান, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।
ডিজেলে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টনই ডিজেল। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় মূল্য প্রতি লিটার প্রায় ২০৫ টাকা। অথচ মূল্য সমন্বয়ের আগে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকা দরে।
অর্থাৎ প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ টাকা লোকসান হচ্ছিল। দাম সমন্বয়ের পরও বিপিসিকে গড়ে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মূল্য সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হতো। সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে এই ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা হতে পারত।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রভাবের আশঙ্কা
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলে বড় অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই বিকল্প না থাকায় সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি উপলব্ধি করবেন।
প্রতিবেশী দেশগুলোর দামের তুলনা
আঞ্চলিক দেশগুলোর জ্বালানি তেলের দামের তুলনা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কলকাতায় ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা এবং ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা।
এ ছাড়া ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা দরে ডিজেল বিক্রির কথা জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্য সমন্বয়ের আগে এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল।
পাচার ঠেকাতেও দাম সমন্বয়
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, কম দামের কারণে দেশে বিক্রি হওয়া জ্বালানি তেল প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের অর্থে কেনা জ্বালানি যাতে পাচার না হয় এবং একই সঙ্গে সামাজিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখা যায়, সে বিষয়টিও দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্তে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব যাতে সাধারণ মানুষের ওপর সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করা হবে, যাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে।
সংকট কেটে গেলে আবার দাম সমন্বয়ের আশা
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটকে অতীতের সংকটের সঙ্গে তুলনা করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কিংবা কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের পরিস্থিতির সঙ্গেও সরাসরি তুলনীয় নয়।
জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্তকে কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণের পরই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনগণের সম্ভাব্য কষ্টের বিষয়টি তিনি উপলব্ধি করেন বলেও জানান।
সবশেষে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আশা প্রকাশ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত কেটে যাবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার স্বাভাবিক হলে সরকার দ্রুত আবার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করবে। তখন আগের দামে, এমনকি তার চেয়েও কম দামে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানান তিনি।























