মজুরি বোর্ড গঠনে দলীয়করণ করেছে সরকার: গোলাম পরওয়ার
- আপডেট সময় : ০১:৩৮:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৫৮ বার পড়া হয়েছে
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনে সরকার দলীয়করণের আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন ও শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা নিরসনে সরকার এককভাবে সফল হতে পারবে না। এ সংকট সমাধানে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করতে হবে।
একই সঙ্গে শ্রমিক ও শিল্পমালিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলন, মজুরি বোর্ড গঠন এবং শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে সরকার দলীয়করণের আশ্রয় নিয়েছে। মজুরি নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এ ধরনের উদ্যোগ অনুচিত। এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব ও মতামত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংকট সমাধানে বিরোধী দলকে সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু শ্রমিকদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। শিল্পমালিক, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তার মতে, বিরোধী দলকে বাইরে রেখে বর্তমান পরিস্থিতির কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধী দলের মতামত নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, শিল্পমালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শ্রমিক আন্দোলনে বাইরের শক্তির ইন্ধনের অভিযোগ
পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে বাইরের কোনো শক্তি অশুভ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াতের এই নেতা।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে কেউ যেন নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের নামে শ্রমিকদের ওপর অমানবিক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণে শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমিকদের ভয় দেখিয়ে কিংবা আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যাবে না। যারা আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের অভিযোগ ও দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে। কোনো পক্ষের ওপর একতরফা দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে এগিয়ে আসতে হবে।
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন
এদিকে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকরা। তাদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের এসব দাবিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এতে পোশাক কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে গত ১ নভেম্বর সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে। শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এ বোর্ডকে। এরই মধ্যে বুধবার (৪ নভেম্বর) বোর্ডের প্রথম দিকের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শ্রমিক-মালিকদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক
শিল্পাঞ্চলে চলমান উত্তেজনা ও সহিংস পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বুধবার সন্ধ্যায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জরুরি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে শ্রমমন্ত্রী, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এ সময় শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি, মালিকপক্ষের অবস্থান এবং শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি চলমান অস্থিরতা নিরসন এবং কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রেখে শ্রমিকদের দাবি ও মালিকদের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পোশাকশিল্পে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষ যুক্ত। ফলে এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ পরিস্থিতিতে মজুরি বোর্ডে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিত্ব, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি এবং বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এনেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। এখন শ্রমিকদের দাবি ও শিল্পের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।




















