বাসাইলে সেতুতে রডের বদলে বাঁশ, এবার দুদকের অভিযান
- আপডেট সময় : ০৫:১৮:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪৯ বার পড়া হয়েছে
টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের একটি দল সেতুটি পরিদর্শন করে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন। এ সময় উপসহকারী পরিচালক মো. বাসেদ আলীসহ দুদকের অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সেতুর ফুটপাত ও রেলিং ভেঙে পরীক্ষা
দুদক কর্মকর্তা বিপ্লব হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে সেতুটিতে অনিয়মের বিষয়টি তাদের কাছে মনে হয়েছে। তাই ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা করা হয়েছে।
তিনি জানান, সেতুটিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রড পাওয়া যাচ্ছে না। সরেজমিনে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। দুদকের বিশেষজ্ঞরা পরবর্তী সময়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেবেন। প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে বিষয়টি কমিশনকে জানানো হবে। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাঁশ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে ব্যবহৃত বাঁশ তারা দেখতে পাননি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি দেখা গেছে। সাটারিংয়ের কাজে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টিও তারা দেখেছেন।
সাব-ঠিকাদার গ্রেপ্তার, মামলা
এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাসাইল থানায় মামলা হওয়ার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর কাছ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার শাহ আলমের বয়স ৪৪ বছর। তিনি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বালাপাড়া এলাকার মৃত নবুর উদ্দিনের ছেলে।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার প্রধান আসামি ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম এবং অপর আসামি সাব-ঠিকাদার শাহ আলম।
সাময়িক বরখাস্ত প্রকৌশলী, দুই কর্মকর্তাকে শোকজ
ঘটনার পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) এক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক অফিস আদেশ ও চিঠিতে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়, নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি
ঘটনাটি তদন্তে বাসাইল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে।
কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম এবং উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন।
এদিকে সেতুটি পরিদর্শন করেছেন এলজিইডির ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক।
১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতু
বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়কের অংশ হিসেবে নির্মাণাধীন সেতুটির দৈর্ঘ্য ৯০ দশমিক ০৬ মিটার।
সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ কাজ।
স্থানীয়দের ভিডিওতে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন।
বিষয়টি স্থানীয়রা দেখতে পেয়ে কাজ বন্ধ করতে বাধা দেন। এ সময় তারা মোবাইল ফোনে কাজটির ভিডিও ধারণ করেন। স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর আবার রাতে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে তা শেষ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেয়।
উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বলেন, ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের না জানিয়ে রাতে ওয়াকওয়ে ও ফুটপাতের ঢালাইয়ের কাজ করেন। বিষয়টি ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




















