তুরস্কের সাবেক মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেত্রী গ্রেপ্তার
- আপডেট সময় : ০৬:৩৪:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৭২ বার পড়া হয়েছে
তুরস্কে কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগ তহবিল কেলেঙ্কারির তদন্তে সাবেক মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেত্রী ফাতমা বেতুল সায়ান কায়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুঁজিবাজার আইন লঙ্ঘন এবং অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে গঠিত একটি সংগঠনের সদস্য হওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইস্তাম্বুলের একটি আদালত বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কায়াকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগ তহবিলসংক্রান্ত অনিয়মের তদন্তের অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় এরই মধ্যে দেশটির বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেত্রী কায়া
ফাতমা বেতুল সায়ান কায়া তুরস্কের রাজনীতিতে বেশ পরিচিত মুখ। তিনি ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশটির পরিবারবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একে পার্টি) গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান।
তিনি দলটির উপপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তার গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশটির রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিনিয়োগ তহবিল কেলেঙ্কারিতে তার নাম জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। প্রধান বিরোধী দল ইয়েনি পার্টির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে বিনিয়োগসংক্রান্ত লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ তোলা হয়।
এসব অভিযোগ সামনে আসার পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান। পরে ক্ষমতাসীন একে পার্টি থেকেও পদত্যাগ করেন।
শেয়ার কেনাবেচায় লাখ লাখ ডলার আয়ের অভিযোগ
বিরোধী দলের এক আইনপ্রণেতার অভিযোগ, ফাতমা বেতুল সায়ান কায়া ও তার স্বামী বিনিয়োগসংক্রান্ত কয়েকটি শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে লাখ লাখ ডলার আয় করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিনিয়োগ তহবিলের অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার আগেই তারা সংশ্লিষ্ট শেয়ার বিক্রি করে দেন। এতে তাদের লেনদেনের সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
বিশেষ করে, কেলেঙ্কারির তথ্য প্রকাশের আগেই তারা বিষয়টি জানতেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অপ্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবহার করে শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়াকে ইনসাইডার ট্রেডিং বলা হয়।
এ ধরনের লেনদেন পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তখন একই তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান না।
তবে কায়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো বিচারাধীন। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে এসব অভিযোগ প্রমাণিত বলে বিবেচনার সুযোগ নেই।
কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় পাঁচ লাখ বিনিয়োগকারী
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কের কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগ তহবিল কেলেঙ্কারির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর থেকে দেশটির আর্থিক খাতে এ ঘটনা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনায় প্রায় পাঁচ লাখ বিনিয়োগকারীর সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়ায় দেশটির শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, কীভাবে বিনিয়োগ তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে। একই সঙ্গে কারা এসব অনিয়মের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
এ ছাড়া শেয়ারবাজারে পরিকল্পিত কারসাজি হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন, শেয়ার কেনাবেচার সময় এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের বিষয়গুলো পরীক্ষা করছেন তদন্তকারীরা।
বিশেষ করে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর আগেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আর্থিক সুবিধা নিয়েছিল কি না, তা বের করার চেষ্টা করছেন সরকারি কৌঁসুলিরা।
বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে ১১২ জন
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে গত মঙ্গলবার তুরস্কের বিচারমন্ত্রী আকিন গুরলেক জানান, এ ঘটনায় বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ১১২ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিনিয়োগ তহবিল কেলেঙ্কারির তদন্তে ব্যাপক পরিসরে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আর্থিক লেনদেনে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে সাবেক মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেত্রীর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্ত নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা একজন সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ তুরস্কের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তুরস্কের পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের কাছে এ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। কয়েক লাখ মানুষের সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দেশটির পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে, বিনিয়োগ তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অপ্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করে শেয়ার কেনাবেচা ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও কঠোর করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
তবে কেলেঙ্কারির পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্ত শেষ হলে অর্থ আত্মসাৎ, বাজার কারসাজি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ ফেরত পাবেন কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় কায়াসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে তুরস্কের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলের।




















