অভিষেকেই জোড়া গোলের জয় এনে দিলেন সালাহ
- আপডেট সময় : ১১:৫৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৬৭৪ বার পড়া হয়েছে
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে বিভিন্ন সেবার বিনিময়ে ফি আদায়ের বিধান রেখে একটি খসড়া আইনের ধারা অনুমোদন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করার অংশ হিসেবে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, ‘হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক খসড়া আইনটি নিয়ে কমিটিতে বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে। বিলটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করছেন আইনপ্রণেতারা।
বিভিন্ন সেবার বিপরীতে দিতে হবে ফি
কমিটির মুখপাত্র হাসান কাশকাভি জানান, আগের বৈঠকে স্থগিত থাকা বিলটির তৃতীয় ধারা পর্যালোচনার পর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ওই ধারায় হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে বিভিন্ন ধরনের সেবার বিপরীতে অর্থ নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নৌ চলাচল-সংক্রান্ত সহায়তা, পরিবেশ সুরক্ষা, বিশেষ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ, বিমা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সেবার জন্য ফি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের সময় ইরানের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সেবা নিলে তার বিপরীতে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রণালীর ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে চায় তেহরান।
কাশকাভি বলেন, যেসব দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে, তাদের কাছ থেকেই এসব ফি আদায় করা হবে। ফি ইরানি রিয়ালে অথবা তেহরান কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত অন্য কোনো মুদ্রায় পরিশোধ করা যাবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোর
ইরানের আইনপ্রণেতাদের মতে, এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা এবং জাহাজ চলাচল ঘিরে বিভিন্ন ঘটনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইরান মনে করে, প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকূলীয় দেশগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে প্রস্তাবিত আইনে নিরাপত্তার পাশাপাশি উপকূলীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনায় ইরানের দায়িত্ব ও ভূমিকা আরও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যেই এই আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের অধিকার থাকবে
খসড়া আইনটি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের অধিকারকে অস্বীকার করছে না বলেও জানিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বীকৃত নৌ চলাচলের অধিকার বজায় রেখেই প্রণালীর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে।
কাশকাভির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত করার উদ্দেশ্য নেই। বরং যেসব জাহাজকে প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে, তাদের জন্য নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব সেবার বিপরীতে ফি আদায়ের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
তবে এই বিধান বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, কোন ধরনের জাহাজের জন্য কত ফি নির্ধারণ করা হবে এবং কোন কর্তৃপক্ষ তা সংগ্রহ করবে—এসব বিষয় চূড়ান্ত আইনে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, তেলজাত পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বড় তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পাঠাতে এই নৌপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে হরমুজের গুরুত্ব অনেক।
ফলে এই জলপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজে কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে নতুন উদ্যোগ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানের এই উদ্যোগ সামনে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বেড়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নতুন ফি আরোপের বিধান আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন নিয়ম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, হরমুজের মতো কৌশলগত জলপথে অতিরিক্ত কোনো খরচ যুক্ত হলে তার প্রভাব শুধু জাহাজ পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে তা পরোক্ষভাবে জ্বালানি সরবরাহের সামগ্রিক খরচেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তেল ও গ্যাসের দামে প্রভাবের আশঙ্কা
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় এই জলপথকে ঘিরে যেকোনো নতুন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে নজর কাড়ে। নতুন ফি কার্যকর হলে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বাড়তে পারে।
পরিবহন ব্যয় বাড়লে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে ফি ও অন্যান্য ব্যয় বাড়লে এর কিছু অংশ তেল ও গ্যাসের দামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ফি-এর পরিমাণ, তা কীভাবে আদায় করা হবে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলো নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেয় তার ওপর।
এখনো চূড়ান্ত আইন হয়নি
ইরানের পার্লামেন্টের কমিটি খসড়া আইনের একটি ধারা অনুমোদন করলেও পুরো আইনটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিলটির অন্যান্য ধারা নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে। পরবর্তী সময়ে পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে আইনটির চূড়ান্ত রূপ নির্ধারিত হবে।
এ কারণে এখনই হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী সব জাহাজের ওপর নতুন ফি কার্যকর হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না। ফি আদায়ের পদ্ধতি, পরিমাণ ও বাস্তবায়নের সময়সূচিও পরবর্তী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় নিজেদের ভূমিকা আরও জোরালো করার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের অধিকার বজায় রাখার কথাও জানিয়েছে দেশটি।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের যেকোনো নতুন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে খসড়া আইনটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে চূড়ান্ত হয় এবং বাস্তবে কী ধরনের ফি আরোপ করা হয়, সেদিকে এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে।


























