সন্দেহের ভিত্তিতে বাংলাদেশি বলে ফেরত পাঠানো যাবে না: কলকাতা হাইকোর্ট
- আপডেট সময় : ১২:৪০:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪৪ বার পড়া হয়েছে
শুধু প্রতিবেশীদের বক্তব্য বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের কলকাতা হাইকোর্ট। কাউকে বিদেশি বা বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত করে বহিষ্কারের আগে তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণের যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নথিপত্র যাচাই এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আদালত।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬
নাগরিকত্ব প্রমাণের সুযোগ দিতে হবে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তিকে আটক এবং বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে করা একটি আবেদনের শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য এসব পর্যবেক্ষণ দেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আদালতে ওই ব্যক্তির আইনজীবী রবিউল ইসলাম জানান, কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্য থেকে তৈরি সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁর মক্কেলকে গত ৮ আগস্ট থেকে আটক রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, দুই মাসের বেশি সময় ধরে ওই ব্যক্তি আটক রয়েছেন। অথচ তাঁর নাগরিকত্ব নির্ধারণে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
ওই ব্যক্তির স্ত্রী তাঁর স্বামীকে আটক রাখা এবং দম্পতিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন। বিদেশি আঞ্চলিক নিবন্ধন দপ্তর (এফআরআরও) তাঁদের ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই ব্যক্তির স্ত্রীকে আটক করা হয়নি।
ফেরত পাঠানোর নির্দেশ স্থগিত
শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে মনে হচ্ছে। নাগরিকত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর বক্তব্য শোনা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।
আদালত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশটি আপাতত স্থগিত রেখেছেন। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে কেন দুই মাসের বেশি সময় ধরে আটক রাখা হয়েছে এবং তাঁর জাতীয়তা নির্ধারণে কর্তৃপক্ষ কেন স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণ করেনি, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি।
তিনি বলেন, শুধু কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্যের ভিত্তিতে কীভাবে কারও জাতীয়তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব? যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক রাখা যায় না বলেও জোর দেন তিনি।
বিচারপতি আরও প্রশ্ন তোলেন, ১৯৭০-এর দশক থেকে কত মানুষ সীমান্ত পার হয়েছেন, তাঁদের সবাইকে কি ফেরত পাঠানো সম্ভব? তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কাউকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে।
পরে বিষয়টি উপযুক্ত বেঞ্চে শুনানির জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেন তিনি।
জাল নথির অভিযোগ রাজ্য সরকারের
রাজ্য সরকারের পক্ষে আদালতে উপস্থিত অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার দাবি করেন, আটক ব্যক্তি জাল নথির ভিত্তিতে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড ও প্যান কার্ডের মতো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে থাকতে পারেন।
তবে আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, এমন অভিযোগ থাকলেও যথাযথ যাচাই ছাড়া কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিযোগের পাশাপাশি প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাভাষীদের বহিষ্কার নিয়ে বিতর্ক
ভারতে বাংলাভাষী মানুষদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে আটক ও বহিষ্কারের অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত একাধিক রাজ্যের বিরুদ্ধে বাংলাভাষী মুসলিমদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, আদালত বা ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ ছাড়াই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সহায়তায় কিছু মানুষকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া চার ভারতীয় নাগরিককে গত জুলাইয়ে আদালতের নির্দেশে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন নারী ও দুটি শিশু ছিল। প্রায় এক বছর বাংলাদেশে কাটানোর পর মালদার মহদীপুর স্থলবন্দর দিয়ে তাঁদের ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়।
নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগ
ভারতে নাগরিকত্ব, পরিচয়পত্র এবং ভোটার তালিকা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে। দেশটির ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলো আপত্তি জানিয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের একটি অংশও তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। পশ্চিমবঙ্গেও নাম বাদ পড়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বহিষ্কৃত হওয়ার আশঙ্কায় কিছু মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কাউকে বাংলাদেশি বা বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাঁর পরিচয় ও নাগরিকত্ব সম্পর্কে যথাযথ যাচাই করা প্রয়োজন। কেবল সন্দেহ বা অন্যের বক্তব্যের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বহিষ্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন এবং নাগরিকত্বের পক্ষে প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
























