দাদার কবরের পাশে শায়িত তাজমিন
- আপডেট সময় : ০৫:৩০:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৮৮ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৪) যশোরে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বেলা ১১টায় যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার মা-বাবা। এদিকে, তাজমিনের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
দাদার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় তাজমিন
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাজমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শুক্রবারও শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ভিড় করেন প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা।
তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে বসবাস করত সে। সেখানে স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত তাজমিন। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা-বাবা এখন শোকে স্তব্ধ।
বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি ছাড়ে
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরের একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি জানান, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তাজমিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা জানায়।
বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ২টার দিকে তাজমিনের ফোন থেকে একটি বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠানো হয়। বার্তায় তাকে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। তবে ঘুমিয়ে থাকায় তখন তিনি বার্তাটি দেখতে পারেননি। সকালে বার্তা দেখে লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের দৃশ্য দেখতে পান তিনি।
তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, মেয়ের সঙ্গে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার বিকেলে কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন এক বান্ধবীর বাড়িতে থাকার কথা জানিয়ে তাকে নিয়ে যেতে বলেছিল। বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি বলে দাবি করেন তিনি। মেয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন কেয়া খাতুন।
যেভাবে এগোচ্ছে পুলিশের তদন্ত
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল তাজমিন। সে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যায়। পরে বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এরপর কীভাবে তাজমিন লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার ধানক্ষেতে পৌঁছায়, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তাজমিন যে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াত করে থাকতে পারে, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এ ঘটনায় সুমন নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে আটক করেছে পুলিশ। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম নগরী থেকে তাকে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশের চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণ বাঁচাতে সে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
তবে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানিয়েছেন, মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় আপাতত কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করতে চান না তিনি। তার ভাষায়, মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছে এবং কারা তাকে হত্যা করেছে, তা জানতে চান তিনি।
এ ঘটনায় আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতি ও ঘটনার বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলন করা হবে।
পড়াশোনায় মেধাবী তাজমিন ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তার এমন মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোক বিরাজ করছে। স্বজন ও স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের শনাক্তকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।























