ত্রিশালের খীরু নদীর জরাজীর্ণ সেতু যেন মৃত্যুফাঁদ
- আপডেট সময় : ০১:৪৬:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪২ বার পড়া হয়েছে
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার পোড়াবাড়ি এলাকায় খীরু নদীর ওপর নির্মিত পুরোনো সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সেতুটির বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। যানবাহন, শিক্ষার্থী, পথচারী, কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী—সব শ্রেণির মানুষকেই প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে সেতুটি পার হতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির এমন বেহাল দশা হলেও কার্যকরভাবে সমস্যার সমাধান হয়নি। এরই মধ্যে সেতুতে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় কেউ স্বজন হারিয়েছেন, আবার কেউ গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। ফলে স্থানীয়দের কাছে খীরু নদীর এই সেতু এখন যোগাযোগের মাধ্যমের চেয়ে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত পুরোনো সেতুটি সংস্কার এবং পাশেই নির্মিত নতুন সেতুটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন।
ঝুঁকি নিয়েই সেতু পারাপার
পোড়াবাড়ি এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে খীরু নদীর ওপরের এই সেতুটি সরাসরি জড়িত। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মস্থলে যেতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন। কিন্তু সেতুটির জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে সামান্য অসতর্কতাতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের সময় পথচারীদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকি বেশি। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, “আমার ভাইকে হারিয়েছি এই ব্রিজে। কিছুদিন আগে এখানেই একটি ঘোড়াও মারা গেছে। একের পর এক মানুষ পা হারিয়ে আজ পথে বসেছে।”
কথা বলার সময় নিজের স্বজন হারানোর কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি দ্রুত সেতুটি সংস্কারের দাবি জানান।
সাইকেল নিয়ে পড়ে গিয়েছিল পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী
সেতুটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরাও আতঙ্কের মধ্যে চলাচল করছে। স্থানীয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবিদ জানায়, একদিন সাইকেল নিয়ে সেতুর ওপর পড়ে গিয়েছিল সে।
আবিদের ভাষায়, “আমি সাইকেল নিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। এখন ব্রিজটা ঠিক না করলে মুরুব্বিদের চলতে সমস্যা হয়। আমরাও যেতে পারি না।”
স্থানীয়রা বলছেন, শিশুদের স্কুলে যাতায়াতের সময় অভিভাবকদের বাড়তি দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। সেতুটির অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।
‘সরকার পরিবর্তন হয়েছে, সেতুর ভাগ্য বদলায়নি’
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশে তিনটি সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কিংবা খীরু নদীর এই ব্রিজের কোনো পরিবর্তন হয়নি।”
তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে এলাকার মানুষ সেতুটির দুরবস্থা দেখে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের কথা বলা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
হাবিব মিয়ার দাবি, বর্তমান সরকার যেন দ্রুত জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেতুর সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়। নতুন সেতু প্রস্তুত থাকলে সেটি দ্রুত চালু করা এবং পুরোনো সেতুর প্রয়োজনীয় সংস্কার করার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও চরম দুর্ভোগ
সেতুটির বেহাল অবস্থার কারণে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
মঠবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক বাংলা শিক্ষক বলেন, প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াতের সময় তাকে এই সেতুর ওপর দিয়ে যেতে হয়। সেতুর অবস্থা দেখে প্রতিদিনই আতঙ্ক তৈরি হয়।
তিনি বলেন, “দলীয় পরিচয় যাই থাকুক, প্রতিদিন একদম অসহায়ত্বের মতো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। এখানে প্রতিনিয়ত নানা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আমি চাই দ্রুততম সময়ে এই ব্রিজটির জরুরি সংস্কার করা হোক।”
তার মতে, একটি জনগুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা উচিত নয়। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পেটের তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে ভ্যান চালান
সেতুটির ওপর দিয়ে প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে চলাচল করেন নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের মধ্যে ভ্যানচালক ও দিনমজুরদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয় ভ্যানচালক রিপন মিয়া বলেন, “পেটের তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন এই ব্রিজে ভ্যান চালাতে হয়। কত লোককে চোখের সামনে এই ব্রিজের কারণে পঙ্গু হয়ে যেতে দেখলাম! কিন্তু আমাদের এই দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই।”
তিনি বলেন, সেতুটি দিয়ে ভ্যান চালানোর সময় ভারসাম্য রাখতে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হয়। কোনো কারণে ভ্যানের চাকা পিছলে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
পাশেই নতুন সেতু, তবু কাজে আসছে না
স্থানীয়দের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হলো—জরাজীর্ণ পুরোনো সেতুর পাশেই নতুন একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেটি এখনো জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়নি।
ফলে নতুন সেতু নির্মাণের পরও মানুষকে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, নতুন সেতুটি ব্যবহার করা গেলে পুরোনো সেতুর ওপর চাপ কমত এবং মানুষের চলাচলও অনেকটা নিরাপদ হতো।
তাদের প্রশ্ন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরও যদি সেটি ব্যবহার করা না যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের অবসান হবে কীভাবে?
ভূমি অধিগ্রহণের আইনি জটিলতা
নতুন সেতুটি চালু না হওয়ার বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসনাত জাহান খান বলেন, পুরোনো সেতুর পাশেই নতুন একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত আইনি জটিলতার কারণে সেটি চালু করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে খুব দ্রুতই একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
প্রশাসনের এই বক্তব্যের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন, আইনি জটিলতা থাকলে সেটি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন? নতুন সেতু প্রস্তুত থাকার পরও সেটি ব্যবহার করতে না পারায় পুরোনো সেতুর ওপর মানুষের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
আর কত দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, সমস্যাটি দীর্ঘদিনের হলেও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ ঝুঁকি নিয়ে সেতুটি পার হচ্ছেন। দুর্ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় পরিস্থিতি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—ভূমি অধিগ্রহণের আইনি জটিলতা নিরসনে আর কত প্রাণ ঝরবে? নতুন সেতু প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কেন সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতু ব্যবহার করতে হবে?
দ্রুত নতুন সেতু চালুর দাবি
পোড়াবাড়ি এলাকার মানুষের দাবি, মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসন করে নতুন সেতুটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো সেতুটির অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, খীরু নদীর এই সেতু শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়; এটি আশপাশের এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই সেতুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আর দীর্ঘসূত্রতা না করে দ্রুত উদ্যোগ নেবে। নতুন সেতু চালু এবং পুরোনো সেতুর টেকসই সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে—এমনটাই আশা পোড়াবাড়ির বাসিন্দাদের।






















