গণপূর্তের “মাফিয়া” আসাদুজ্জামান এখনো সংসদ ভবনের দায়িত্বে!
- আপডেট সময় : ১০:২৪:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৬০৭ বার পড়া হয়েছে
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-৩-এ কর্মরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান লিপ্টনকে ঘিরে বিভিন্ন মুখি অভিযোগ জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, পদায়ন, অতিরিক্ত দায়িত্ব , সংসদ ভবন এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন এবং পতিত সরকারের দোসর। তিনি আগের সরকার আমলে যেমনভাবে রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় ছিলেন, ঠিক এ সরকার আমলেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। স্যারদের ম্যানেজ করে সংসদ ভবনের মত এলাকায় তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। আর্থিক লেনদেন নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
আসাদুজ্জামানকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—একটি শূন্য পদে নতুন কর্মকর্তা পদায়ন না করে তাঁকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-৩-এর অধীন ই/এম বিভাগ-৭, উপ-বিভাগ-১৩ (শাখা-২)-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী হেলাল আহমদের পদ শূন্য হওয়ার পর সেখানে নতুন করে কোনো উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদায়ন করা হয়নি। পরিবর্তে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে তাঁর নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি ওই শূন্য পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। যার স্মারক নং-১৭৯৯, তারিখ ১০ মার্চ ২০২৬-এর অফিস আদেশের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ মাহবুবুর রহমান তাঁকে এ দায়িত্ব দেন বলে জানা গেছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী তার অফিস আদেশ টি দেওয়ার কথা ছিলো আসাদুজ্জামানের উপরস্থ কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী। বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা পরিষদের সাবেক সহসভাপতি আসাদুজ্জামান লিপটনের ক্ষমতা প্রভাব ও অবৈধ সম্পদ সহ বিভিন্ন তথ্যাদি এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
অভিযোগে প্রকাশ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী দোসর আসাদুজ্জামান লিপটন কিছু দিন নিরব ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আবার সরগরম হোন। অথচ সংশ্লিষ্ট এই কর্মকর্তার সংসদ এলাকায় দায়িত্ব থাকার কথা নয়। তার দায়িত্বে থাকার বিষয়টি নিয়ে যখন পুরো গণপূর্ত জুড়ে প্রশ্ন উঠেছে, ঠিক তখনই তাঁকে আবার একটি শূন্য পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রশাসনিক ভাবে। এর যৌক্তিকতা বা কি স্বার্থে তাকে এতো সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? আসাদুজ্জামানের শেলটার দাতা কে? নাকি কোন গোপন মিশনে লিপ্ত রয়েছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।একটি শূন্য পদে নিয়মিত কর্মকর্তা পদায়ন না করে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
লটারির বাইরে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সাম্প্রতিক পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে লটারির ব্যবস্থা এবং একই জেলা, সার্কেল, বিভাগ ও উপ-বিভাগে পুনরায় পদায়ন না করার নীতি অনুসরণ করা হলেও মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের ক্ষেত্রে একই সার্কেলের অধীনে দায়িত্ব অব্যাহত রাখা হয়েছে। এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে তার কোন জবাব মিলছেনা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সকল কর্মকর্তার ক্ষেত্রে একই নীতিমালা প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তাছাড়া লটারি পদ্ধতি সঠিক ভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কোন সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে কিনা, তা নিয়েও আছে নানান কথা।
সংসদ ভবনে দীর্ঘদিনের দায়িত্ব নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে সংসদ ভবন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন।গুরুত্বপূর্ণ ও ভিভিআইপি স্থাপনায় দীর্ঘ সময় ধরে একই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের ছেলে রেজওয়ান আহমেদ তৌফিকের সঙ্গে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের বন্ধুত্ব ছিল। ছাত্রজীবনে তাঁরা একই সময়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁদের দাবি, তিনি ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ছাত্রলীগের ভিপি মনোনীত প্যানেলের একটি পদে নির্বাচনও করেছিলেন। যদিও নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি লিপটন। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে তাঁর সরকারি দায়িত্ব বা পদায়নে কোনো প্রভাব পড়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে ছবি রয়েছে। তাঁদের মতে, এসব ছবি তাঁর আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান লিপ্টনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের সমর্থনে বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের সহ-সভাপতি পদে থাকা সংক্রান্ত কমিটি এবং আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতা ও নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে। এসব নথি ও ছবি তাঁর অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে বলে তারা দাবি করেন।
সম্পদ ও ব্যবসা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
আসাদুজ্জামানের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ির ব্যবসা/শোরুম, কার্গো ব্যবসা ও কাভার্ড ভ্যানের ব্যবসা থাকার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থপাচারের গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে।
সূত্রমতে, তিনি দুটি গাড়ি ব্যবহার করেন—সকালে একটি এবং বিকেলে অন্যটি। এর মাধ্যমে তাঁর ব্যবহৃত গাড়ি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং তার নিজের গাড়ি এটা যেন বুঝতে অসুবিধা হয়। চালাক লিপটন,সংসদ ভবনের গেট পর্যন্ত গাড়িতে এসে তিনি সেখান থেকে হেঁটে অফিসে প্রবেশ করেন।
কথিত অর্থ বহন ও শামীম পাটোয়ারীর প্রসঙ্গ
অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর অর্থ বহনের সঙ্গে এসি মেকানিক শামীম পাটোয়ারী নামের একজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে। অভিযোগকারীরা তাঁকে সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির অঘোষিত এপিএস হিসেবে দাবি করেছেন।
মাসোহারার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা ও প্রভাব ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়মিত কথিত ‘মাসোয়ারা’ দেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগ, কথিত এই অর্থের একটি অংশ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ মাহবুবুর রহমান এবং সদ্য বিদায়ী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফ-এর কাছে পৌঁছায়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব ব্যক্তিকে ‘ম্যানেজ’ করেই মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান লিপ্টন দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে টিকে আছেন।
প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিকে মাসিক সুবিধার অভিযোগঃ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্টাফ দাবি করেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যাক্তিকে আসাদুজ্জামান নিয়মিত ‘মাসোহারা’ দিয়ে থাকেন। তাদের দাবি, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কক্ষে লটপটকে প্রায়ই ভালো-মন্দ খাবারের আয়োজন করতে দেখা যায়। সেখানে অনেক আওয়ামী দোসর এই আপ্পায়নে সামিল হোন।
তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীরা তাঁর সম্পদ বিবরণী, আয়-ব্যয়, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা, পদায়নসংক্রান্ত নথি এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের আদেশ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজন হলে গণপূর্ত অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত। কোনো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং কোনো অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।
উল্লেখ্য সংসদ চলাকালীন সময়ে সবার আগে বাংলাদেশ প্রতিপাদ্যে চলমান সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়ের মূল হোতা আসাদুজ্জামান লিপটন এবং তার টেন্ডারে নিম্নমানের সাউন্ড সিস্টেম ক্রয় সামগ্রী এবং ঠিকাদার নির্বাচনেও তার জোরালো ভূমিকা রয়েছে
অভিযোগের বিষয় নিয়ে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান লিপ্টনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হতো।

























