একাধিক মামলার সাজা একসঙ্গে চলার সুযোগ নেই : হাইকোর্ট
- আপডেট সময় : ১২:০১:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪১ বার পড়া হয়েছে
একাধিক ফৌজদারি মামলায় পৃথকভাবে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তির সাজা আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া একই সময়ে কার্যকর হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, পৃথক মামলায় সাজা দেওয়ার সময় রায়গুলোতে সাজা একসঙ্গে চলবে—এমন সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে একটি মামলার সাজা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী মামলার সাজা কার্যকর হবে।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
যে মামলায় হাইকোর্টের রায়
চেক ডিজঅনারের পৃথক ছয়টি মামলায় দণ্ডিত চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিনকে কারাগারে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের শুনানি শেষে এ রায় দেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী।
রায়ে রিট আবেদনটি খারিজ করে নাসির উদ্দিনকে দুই মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ছয় মামলায় দণ্ডিত নাসির উদ্দিন
রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনারের ছয়টি পৃথক মামলা হয়। এসব মামলায় তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একপর্যায়ে সাজা ভোগের মেয়াদ শেষ হলেও তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ১১ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল জারি করেন। একই সঙ্গে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনও দেওয়া হয়।
রিটে যে দাবি করা হয়
রিটকারীর আইনজীবী মো. শাহ আলম আদালতে যুক্তি দেন, মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নাসির উদ্দিন কারাগারে ছিলেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার আওতায় ওই সময়কে সাজা থেকে সমন্বয় করা হলে তার সাজা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তাই তাকে কারামুক্ত করা উচিত।
অন্যদিকে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী মো. সমীর সাত্তার যুক্তি দেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী একাধিক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা একই সঙ্গে চলবে—এমন স্পষ্ট নির্দেশ বিচারিক আদালত না দিলে সাজাগুলো ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
তিনি আরও বলেন, বিচারাধীন অবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট মামলায় আসামি যে সময় কারাগারে ছিলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার আওতায় কেবল ওই মামলার সাজা থেকে সেই সময় বাদ যাবে। এক মামলায় ভোগ করা কারাভোগের সময় অন্য মামলার সাজা কমানোর জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
সাজা কার্যকরের বিষয়ে হাইকোর্টের ব্যাখ্যা
পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট রুল খারিজ করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা অনুযায়ী বিচার চলাকালে কোনো আসামি নির্দিষ্ট যে মামলায় কারাভোগ করেছেন, কেবল সেই মামলার মোট সাজা থেকে ওই সময় বাদ দেওয়া যাবে।
অন্যদিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী, পৃথক মামলায় সাজা দেওয়ার সময় বিচারিক আদালত যদি সাজাগুলো একসঙ্গে চলার নির্দেশ না দেন, তাহলে প্রতিটি মামলার সাজা একের পর এক কার্যকর হবে।
অর্থাৎ, একাধিক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাজাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই সময়ে চলবে না। সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়ে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকতে হবে।
দুই মাসের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ
হাইকোর্ট নাসির উদ্দিনকে রায় ও আদেশের তারিখ থেকে দুই মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে নিম্ন আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করতে পারবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাভোগের সময় হিসাবের নির্দেশ
রায়ে নাসির উদ্দিনের ছয়টি মামলায় বিচার চলাকালে তিনি কতদিন কারাগারে ছিলেন, তার হিসাব করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এ জন্য রিটকারীর আইনজীবীকে একটি ‘ক্যালকুলেশন শিট’ প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। নিম্ন আদালতের নথি পর্যালোচনার পর ওই হিসাব জেল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে।
এরপর কারা কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি মামলায় বিচারাধীন অবস্থায় আটক থাকার সময় হিসাব করে সংশ্লিষ্ট মামলার সাজা থেকে তা বাদ দেবে।
ফৌজদারি মামলায় রিট এখতিয়ারের সীমা
হাইকোর্ট আরও বলেছেন, রিট আবেদনে নাসির উদ্দিন নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। বিচার বা অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো এখতিয়ারগত ত্রুটিও তিনি প্রমাণ করতে পারেননি।
তাই ওই ধারার অধীনে চলমান ফৌজদারি কার্যক্রমে রিটের মাধ্যমে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
আদালত বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা না হলে রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করা যায় না। একইভাবে রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করে বিচারিক আদালতের দেওয়া ফৌজদারি রায়েও হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত।
ফলে নাসির উদ্দিনের করা রিট খারিজ করে আদালত সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।






















