অনলাইন ঋণ প্রতারণার ফাঁদে বাড়ছে ভুক্তভোগী
- আপডেট সময় : ০১:০৮:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৭০৬ বার পড়া হয়েছে
কম সুদে ঋণ, দ্রুত লাভের বিনিয়োগ কিংবা সহজে টাকা পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অনলাইনে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন দেশের অনেক মানুষ। ফোনকল, ফেসবুক পেজ, মেসেজিং অ্যাপ ও ভুয়া মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রতারকেরা সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছে। বিশেষ করে আর্থিক সংকটে থাকা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এসব প্রতারণার ফাঁদে বেশি পড়ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে কম সুদে বড় অঙ্কের ঋণের অফার দেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার দ্রুত বিনিয়োগ করে কয়েক গুণ লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। আকর্ষণীয় এসব প্রস্তাবে বিশ্বাস করে অনেকে প্রতারকদের দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করছেন। এরপর শুরু হয় টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া।
আবেদন ফি ও জামানতের নামে টাকা
ভুয়া ঋণ দেওয়ার কথা বলে প্রথমে আবেদন ফি, ফাইল খরচ, স্ট্যাম্প খরচ, প্রসেসিং ফি কিংবা জামানতের নামে টাকা চাওয়া হচ্ছে। কেউ এসব টাকা পরিশোধ করার পর আরও নানা অজুহাতে অর্থ দাবি করা হয়। একপর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয় যোগাযোগ।
অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকেরা নিজেদের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা অনুমোদিত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়। ভুয়া পরিচয়পত্র, ওয়েবসাইট ও কাগজপত্র দেখিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। ফলে যাচাই না করে অনেকেই তাদের কথায় বিশ্বাস করে টাকা পাঠিয়ে দেন।
ভুয়া অ্যাপেই বিপদ
অনলাইন ঋণ দেওয়ার নামে বেশ কিছু ভুয়া অ্যাপ ব্যবহার করেও প্রতারণা করা হচ্ছে। এসব অ্যাপ মোবাইলে ইনস্টলের সময় ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, যোগাযোগ নম্বর, মেসেজ কিংবা অন্যান্য ডেটায় প্রবেশের অনুমতি চায়।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের আগেই টাকা পরিশোধের চাপ দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক হারে সুদ ও অতিরিক্ত চার্জ যোগ করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় মানসিক চাপ ও হয়রানি।
ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল
প্রতারকদের একটি বড় কৌশল হলো ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করা। ঋণের আবেদনের সময় নেওয়া ছবি, ফোন নম্বর ও যোগাযোগের তথ্য ব্যবহার করে ভুক্তভোগীর পরিচিতদের কাছে ফোন করা হয়। কখনো ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এতে অনেকে সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে প্রতারকদের দাবি করা টাকা দিতে বাধ্য হন। ফলে একটি ছোট ঋণের আশায় শুরু হওয়া বিষয়টি পরে বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক হয়রানিতে পরিণত হয়।
বিনিয়োগের নামেও প্রতারণা
শুধু ঋণ নয়, দ্রুত লাভের বিনিয়োগের নামেও অনলাইন প্রতারণা বাড়ছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম সময়ে বেশি মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রথম দিকে কাউকে সামান্য লাভের টাকা দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হয়। পরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়। টাকা জমা দেওয়ার পর লাভের টাকা তো দূরের কথা, মূল টাকাও ফেরত পাওয়া যায় না। অনেক সময় ওয়েবসাইট বা অ্যাপ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট নম্বরেও আর যোগাযোগ করা যায় না।
অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সির নামেও ফাঁদ
অনলাইন জুয়া, বাজি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম ব্যবহার করেও প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে। সহজে বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের সুযোগ দেখিয়ে মানুষকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে প্রথমে ছোট অঙ্কের টাকা জমা দিয়ে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ দেখানো হয়। এতে ব্যবহারকারীর আস্থা তৈরি হলে তাকে আরও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হয়। পরে অর্থ উত্তোলনের সময় নানা ধরনের ফি বা করের কথা বলে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সতর্ক থাকার পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের
বাংলাদেশ ব্যাংক অবৈধ ঋণ অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে গ্রাহকদের সতর্ক করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ হলো, অনুমোদনহীন কোনো অ্যাপ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করা।
এ ছাড়া অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, কার্ডের তথ্য কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ দেওয়ার আগে টাকা দাবি করলে সেটি যাচাই করা জরুরি। একইভাবে অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে সতর্ক হতে হবে। কারণ বৈধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণত নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণ বা বিনিয়োগ সেবা দেয়।
দ্রুত টাকা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই বড় ঝুঁকি
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের অসচেতনতা এবং দ্রুত টাকা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছে প্রতারক চক্র। আর্থিক সংকটে থাকা মানুষ সহজ শর্তে ঋণের প্রস্তাব পেলে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করেন না।
তারা বলছেন, অনলাইনে কোনো আর্থিক প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রথমেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বৈধ কি না তা যাচাই করতে হবে। শুধু ফেসবুক পেজ, ফোন নম্বর বা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, কোনো অ্যাপ ইনস্টলের আগে সেটি কী ধরনের তথ্যের অনুমতি চাইছে, তা দেখা দরকার। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যক্তিগত তথ্য বা ফোনের বিভিন্ন অংশে প্রবেশের অনুমতি চাওয়া অ্যাপ থেকে দূরে থাকা উচিত।
যাচাই ছাড়া টাকা না দেওয়ার পরামর্শ
সাইবার প্রতারণা ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প নেই। অনলাইনে ঋণ, বিনিয়োগ বা দ্রুত লাভের কোনো প্রস্তাব এলে আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে। টাকা পাঠানোর আগে প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদিত কি না, তাদের অফিস ও যোগাযোগের তথ্য সঠিক কি না এবং অন্য গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা কী—এসব যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোনো অবস্থাতেই অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কথায় ওটিপি কিংবা ব্যাংকিং তথ্য দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক বা অজানা অ্যাপ ইনস্টল থেকেও বিরত থাকতে হবে।
প্রতারণার শিকার হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানানো উচিত। পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের তথ্য, ফোন নম্বর, মেসেজ, লিংক ও অ্যাপের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করা দরকার। এসব তথ্য পরবর্তী তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে।
























