উত্তরের জনপদে শীতের আগমনী বার্তা, ভোরে ঘন কুয়াশা
- আপডেট সময় : ০৬:০০:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৩৬ বার পড়া হয়েছে
দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের আগমনী বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। হিমালয়ের কাছাকাছি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এরই মধ্যে অনুভূত হচ্ছে হালকা শীত। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে জনপদ। বিশেষ করে ভোরের ঠান্ডা বাতাস ও কুয়াশা জানান দিচ্ছে ঋতু পরিবর্তনের।
কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে হেমন্তের প্রকৃতিতে শীতের এমন উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধায়। গত এক সপ্তাহ ধরে এসব এলাকায় ভোরে কুয়াশার ঘনত্ব বাড়ছে। তবে দিনের বেলায় সূর্যের দেখা মিলছে। ফলে এখনো তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।
ভোরের কুয়াশায় বাড়ছে শীতের অনুভূতি
উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভোরের দিকে কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। বিশেষ করে খোলা মাঠ, সড়ক ও নদীতীরবর্তী এলাকায় কুয়াশার উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রংপুরের আব্দুল আহাদ বলেন, এখনো তেমন শীত পড়েনি। তবে সকালে হালকা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। চারপাশে কুয়াশাও দেখা যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে, শীতের অনুভূতি তত বাড়ছে। জুলেখা বলেন, বাতাস উঠলে ঠান্ডা বেশি লাগে। ভোরে কুয়াশা পড়লে শীতের অনুভূতি হয়। সকাল ৭টার পর সূর্যের দেখা মিললে ঠান্ডা কিছুটা কমে যায়। তবে শীত বাড়লে তাদের কষ্ট আরও বাড়বে।
তিনি জানান, তাদের পর্যাপ্ত গরম কাপড় নেই। ফলে শীতের তীব্রতা বাড়লে দুর্ভোগে পড়তে হবে।
কুয়াশায় সড়কে বাড়তি সতর্কতা
ভোরের কুয়াশার কারণে উত্তরাঞ্চলের সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ভোরে দূরের পথ পাড়ি দেওয়া চালকদের পড়তে হচ্ছে কিছুটা বিড়ম্বনায়।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের ট্রাকচালক রফিক বলেন, ভোর থেকে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে থাকে। এ সময় হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। এতে সড়কে চলাচলের সময় বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তবে দিনের বেলায় এখনো তেমন ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে না।
শীতের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কৃষক
রংপুর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তাই আবহাওয়ার পরিবর্তনের দিকে বাড়তি নজর রাখছেন কৃষকরা।
কোথাও আমন ধান কাটার প্রস্তুতি চলছে। আবার কোথাও ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা। পাশাপাশি শীতকালীন সবজি চাষেও সময় পার করছেন কৃষকেরা। ভোরের কুয়াশা ও তাপমাত্রার ওঠানামা ফসলের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চিন্তিত তারা।
কালীগঞ্জের কৃষক বাতেন বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ভোরে ঘন কুয়াশা থাকায় জমিতে কাজ করতে যেতে কিছুটা ভয় লাগে। তবে সকাল ৭টার পর সূর্যের দেখা মেলায় ঠান্ডা কমে যায়। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
বাজারে উঠতে শুরু করেছে শীতবস্ত্র
শীতের আগমনী বার্তায় রংপুরের বাজারগুলোতেও শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। দোকানে উঠতে শুরু করেছে শীতের পোশাক, চাদর ও কম্বল। ক্রেতাদের মধ্যেও শীতবস্ত্র কেনার আগ্রহ বাড়ছে।
রংপুরের জামাল জানান, শীতের পোশাক নিয়ে ব্যবসায়ীরা দোকান সাজিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিক্রিও শুরু হয়েছে। তবে এখনো পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হয়নি।
তিনি বলেন, সব কাপড় ব্যবসায়ী শীতের পোশাক নিয়ে দোকান খুলেছেন। বিক্রি হচ্ছে, তবে এখনো বিক্রি তেমন বাড়েনি।
শীত বাড়তেই হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ
আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে সর্দি, কাশি, জ্বরসহ বিভিন্ন শীতজনিত রোগ দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার আশিকুর রহমান জানান, গত এক সপ্তাহে শীতজনিত রোগে এই হাসপাতালে ৩৮২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে প্রতিদিনই শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক শিশু জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এ সময় শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, তাপমাত্রার ওঠানামার সময় শিশু ও বয়স্কদের ঠান্ডা থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। পাশাপাশি অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১৫ দিনের মধ্যে বাড়তে পারে শীত
রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ভোরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে ভোরে কুয়াশা দেখা দিচ্ছে।
মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তনও আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘ সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার পর মেঘ সরে গেলে ভোরের দিকে কুয়াশা তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানান, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে রংপুর অঞ্চলের কোথাও কোথাও হালকা শীত অনুভূত হতে পারে। পাশাপাশি বয়ে যেতে পারে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ।
এদিকে রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, বিভাগের প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হতদরিদ্র, ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের মধ্যে এসব শীতবস্ত্র বিতরণ করা হবে।
সব মিলিয়ে উত্তরাঞ্চলে শীতের আগমনী বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভোরের কুয়াশা, ঠান্ডা বাতাস ও আবহাওয়ার পরিবর্তন জানান দিচ্ছে শীতের প্রস্তুতির সময় এসেছে। তবে শীতের তীব্রতা বাড়ার আগেই অসহায় মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ রয়েছে।


























