কুমিল্লায় নিখোঁজের চার দিন পর স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার
- আপডেট সময় : ০৫:০৬:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৭১ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লায় নিখোঁজের চার দিন পর জান্নাতুল তাজমিন (১৪) নামের এক স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে জেলার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে তাজমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিখোঁজ হওয়ার পর তাজমিনের গত চার দিনের অবস্থান, কার সঙ্গে তিনি ছিলেন এবং কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। ঘটনার তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে পুলিশ।
সড়কের পাশে পড়ে ছিল অটোরিকশা, জমিতে মরদেহ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকায় সড়কের পাশে একটি ধানের জমিতে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। ঘটনাস্থলের কাছেই একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে ছিল। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
স্থানীয় বাসিন্দা তমাল বনিক জানান, সকালে জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া সংলগ্ন এলাকায় সড়কের পাশে একটি পরিত্যক্ত অটোরিকশা পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হয়। পরে সড়ক থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে একটি ফসলি জমিতে গিয়ে আইলের পাশে মরদেহটি দেখতে পান তারা।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল এবং মুখ মাটির দিকে চেপে রাখা ছিল।
উদ্ধারের সময় মরদেহের পরিচয় জানা যায়নি। পরে পরিবারের সদস্যরা থানায় গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।
বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয় তাজমিন
তাজমিন কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির অনিয়মিত ছাত্রী ছিলেন। তার বাবা আবদুল আলীম যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা এলাকার বাসিন্দা। তিনি একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে কুমিল্লা জেলায় কর্মরত। পরিবারের সঙ্গে নগরের রেইসকোর্স এলাকায় থাকতেন তাজমিন।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তার মেয়ে। এরপর বিভিন্ন সময়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা জানায়।
আবদুল আলীম বলেন, বুধবার গভীর রাতে তাজমিন তাকে একটি মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠায়। সেখানে তাকে এসে নিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়। তবে তখন তিনি ঘুমিয়ে থাকায় মেসেজটি দেখতে পারেননি।
তিনি বলেন, ভোরে ঘুম থেকে উঠে মেসেজটি দেখার পর পাঠানো লাইভ লোকেশন অনুযায়ী ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেখতে পান।
তাজমিনের বাবার অভিযোগ, তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে কুমিল্লা শহর থেকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ
সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লা ফেরদৌস জানান, ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা শহর থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। তবে পুলিশের তদন্তে ওই দিন তার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পরদিন ৫ অক্টোবর সে কুমিল্লায় ফেরে। এরপর ভোররাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লা নগরের পদুয়ার বাজার এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। এরপর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তার যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে।
ওই অটোরিকশা থেকে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পরিবারের দাবি, ব্যাগটি তাজমিনের নয়।
পুলিশ বলছে, নিখোঁজ হওয়ার পর তাজমিন কোথায় ছিল, কার সঙ্গে যাতায়াত করেছে এবং কীভাবে জগতপুর এলাকায় পৌঁছেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এসব তথ্য যাচাইয়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
ধর্ষণের পর হত্যার সন্দেহ পুলিশের
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, তাজমিনের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি।
ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রাতে তাজমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মরদেহ ফসলি জমিতে ফেলে রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি আরও জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাজমিনের গত চার দিনের অবস্থান, তার সঙ্গে কারা ছিলেন এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
নিয়মিত স্কুলে যেত না তাজমিন
ফরিদা বিদ্যায়তনের প্রধান শিক্ষক হানিফ মজুমদার জানান, সপ্তম শ্রেণির হাজিরা খাতা অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের পর তাজমিনের আর উপস্থিতির তথ্য নেই।
তিনি বলেন, তাজমিন অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল কি না, কিংবা পড়াশোনায় বিরতি নিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।























