ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ১৫ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল
- আপডেট সময় : ০৪:০০:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৭৩ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আগামী ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চূড়ান্ত কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দুই পক্ষের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এনসিটিতে ১৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ
চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর ধরে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। একই সময়ে টার্মিনালের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর এই উদ্যোগের ফলে এনসিটির পরিচালন দক্ষতা, সক্ষমতা ও রাজস্ব আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে টার্মিনালের জমি, মূল অবকাঠামো এবং সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। কনসেশনের মেয়াদ শেষ হলে টার্মিনালটি বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ৪৪ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং
চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর প্রধান চারটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে এই টার্মিনালের মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে। এটি চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ।
এনসিটির পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই)।
বাড়তে পারে বন্দরের রাজস্ব
ডিপি ওয়ার্ল্ড নিজস্ব বিনিয়োগে এনসিটির যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করবে। ফলে কনসেশনের মেয়াদে এসব খাতে সরকার বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন কমবে।
এছাড়া চুক্তিতে রাজস্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিটি টিইইউ কনটেইনার থেকে টার্মিনালের গড় আয়ের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্বের একটি অংশ পাবে। চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি টিইইউ থেকে ৪০ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি বা রাজস্বের অংশ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। টার্মিনালের গড় আয় বাড়লে বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্বের অংশও বাড়বে।
কমবে জাহাজ ও পণ্য খালাসের সময়
আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, উন্নত ক্রেন পরিচালনা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং আধুনিক পরিচালন পদ্ধতি চালু হলে জাহাজের বন্দরে অবস্থানের সময় কমে আসতে পারে। পাশাপাশি টার্মিনালে কনটেইনারের অবস্থানকাল কমলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয়ও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মদক্ষতার সূচকের আওতায় ট্রাকের ঘুরে আসার সময় ধীরে ধীরে ৯০ মিনিটে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রেনের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কাগজবিহীন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ
এনসিটির বর্তমান কর্মীদের নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের নতুন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি আধুনিক টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
এর ফলে বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। কনসেশনের মেয়াদ শেষে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও পরিচালন জ্ঞান বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থাও থাকছে।
অক্ষুণ্ন থাকবে রাষ্ট্রীয় মালিকানা
আন্তর্জাতিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত হলেও এনসিটির সম্পদ ও অবকাঠামোর মূল মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আওতাভুক্ত কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমেই পরিচালিত হবে।
অপারেটরের কার্যক্রম তদারকিতে কর্মদক্ষতার সূচক, নিয়মিত প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, নজরদারি ও চুক্তিভিত্তিক জবাবদিহিতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
দেশের লজিস্টিকস খাতে প্রভাব
এনসিটির সক্ষমতা বাড়লে এর প্রভাব শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম পরিবহন করিডোর, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো, কোল্ড চেইন এবং শিল্পপার্কে বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ ভবিষ্যৎ বন্দর প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এনসিটির অভিজ্ঞতা ভূমিকা রাখতে পারে। দ্রুত পণ্য খালাস, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং কম লজিস্টিকস ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
এনসিটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হওয়ার উদ্যোগকে বাংলাদেশের পিপিপি কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটির লেনদেনবিষয়ক পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি)।




















