আর যেন রাজপথে রক্ত দিতে না হয়: ডেপুটি স্পিকার
- আপডেট সময় : ০১:০০:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৩৭ বার পড়া হয়েছে
অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যেন আর রাজপথে নেমে জীবন দিতে না হয়, এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হতে হবে, যেখানে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হবে এবং প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত থাকবে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহমুদ-উল আমীন অডিটরিয়ামে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের নবীনবরণ-২০২৬ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধিকার প্রতিষ্ঠায় রক্তপাত বন্ধের আহ্বান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভূমিকা তুলে ধরে কায়সার কামাল বলেন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। গবেষণা ও শিক্ষার পাশাপাশি দেশের প্রয়োজনেও তারা রাজপথে নেমেছেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও নানা পরিবর্তন এসেছে। তাই ভবিষ্যতে আর রাজপথে গিয়ে বুলেটের মুখোমুখি হতে চান না তারা।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, “আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে, প্রত্যেকের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।”
মেধার মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে বলে মন্তব্য করেন কায়সার কামাল। তার দাবি, ওই আন্দোলন কোনো একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিল না। বরং একটি ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি থেকেই আন্দোলন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে মেধার পরিবর্তে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ ছিল। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রভাব ও দলীয়করণের কারণে অনেকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধার ভিত্তিতে সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দিতে হবে
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থী একটি স্বপ্ন নিয়ে আসে। তাদের কেউ দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আবার কেউ কৃষক, শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলীর পরিবারের সন্তান।
শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বপ্নের পাশাপাশি পরিবারের স্বপ্নও বহন করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই স্বপ্ন বিকাশের সুযোগ তৈরি করা।
নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে কায়সার কামাল বলেন, তিনি কৃষক পরিবারের সন্তান। তার বাবারও তাকে নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কারণে প্রত্যাশামতো পড়াশোনা করতে পারেননি বলেও জানান তিনি।
গতানুগতিক চিন্তার বাইরে যাওয়ার আহ্বান
মুহসীন হলে থাকার সময় দেয়ালে লেখা ‘মানুষ তার আশার সমান বড় হয়’ বাক্যটি তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল বলে জানান ডেপুটি স্পিকার।
তিনি বলেন, নেত্রকোনার গারো পাহাড়ের পাদদেশের একটি এলাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলেন তিনি। শিক্ষার্থীদের চোখের সামনে কোনো সীমা রাখা উচিত নয়। মেধার বিকাশের জন্য নিয়মিত অনুশীলন ও চর্চার প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মেধা বিকাশের চারণক্ষেত্র উল্লেখ করে কায়সার কামাল শিক্ষার্থীদের গতানুগতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে বলেন।
শিক্ষা শেষে দেশের প্রতিও দায়িত্ব পালন
নবীনবরণ শুধু ফুল দিয়ে শিক্ষার্থীদের বরণ করার অনুষ্ঠান নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি দায়িত্বও তুলে দেওয়া হয়। সেই দায়িত্ব প্রথমে নিজের প্রতি, এরপর পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতি।
বিসিএস ও সরকারি চাকরির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিসিএস একটি স্বপ্ন। তবে কর্মজীবনে ভালো অবস্থানে পৌঁছানোর পর দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ হারানো উচিত নয়।
তিনি বলেন, কেউ ভবিষ্যতে সামাজিক নেতা হবেন, কেউ গবেষক হবেন, আবার কেউ বিশ্বখ্যাত অবস্থানে পৌঁছাবেন। তবে যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, নিজের দায়িত্ব ভুলে গেলে চলবে না।
গবেষণা ও ইতিবাচক কাজ সামনে আনার আহ্বান
সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কায়সার কামাল বলেন, বাংলাদেশের তুলনায় পরে স্বাধীনতা পেলেও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তাকে মুগ্ধ করেছে।
শুধু স্বাধীন দেশ, পতাকা ও পাসপোর্ট পাওয়ার গর্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রত্যেক নাগরিককে নিজের জায়গা থেকে দেশের জন্য কতটা কাজ করা হয়েছে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের একার পক্ষে বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও ইতিবাচক কার্যক্রম আরও বেশি সামনে আনার আহ্বান জানান তিনি। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণা ও বিভিন্ন কার্যক্রমেরও প্রশংসা করেন ডেপুটি স্পিকার।
জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের প্রসঙ্গ
জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন কায়সার কামাল। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কয়েক মাস আগে থাইল্যান্ডের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজনকে দেখার অভিজ্ঞতার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি।
তাদের ত্যাগের উদ্দেশ্য হিসেবে মানুষের অধিকার, মেধার মূল্যায়ন এবং সবার জন্য ভালো থাকার মতো একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলেন ডেপুটি স্পিকার।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. শেফালী বেগমসহ শিক্ষক ও নবীন শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।


























