সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর-কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য
- আপডেট সময় : ১১:৪১:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪৯ বার পড়া হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। দল-মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ হলে দেওয়া ভাষণে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক শান্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব
তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়েই দেশের উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন সম্ভাবনার নতুন দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা জানান তিনি।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে জোর
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল দেশের প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। তাই নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগের কথা তুলে ধরেন তিনি।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এসব কার্ডকে সমন্বিত করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।
শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলব্যাগ, ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান
বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।
তিনি বলেন, ‘আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত না হয়।’
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ উত্তরণকে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর জোর দেন তিনি।
আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে।
সংঘাত নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির আহ্বান
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।
ফিলিস্তিন ও নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান
পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
একই সঙ্গে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথা জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চান
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।
এর ফলে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। নিরাপদে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনকে সংকটের সমাধানের মূল পথ হিসেবে তুলে ধরে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।
জলবায়ু ন্যায়বিচারে বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন তারেক রহমান। আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান তিনি।
আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ এবং মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় তিনি বৈশ্বিকভাবে নিঃসরণ কমানো, অভিযোজন অর্থায়ন, জলবায়ু প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।
নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অবদান
নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা মানবতার সেবায় কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণকে ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তার ভাষণে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, নিরাপদ অভিবাসন ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন তিনি। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের আলোচনায় এসব ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।



























