০৪:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের নানা চাপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:৫৩:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৫৬৬ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নানা চাপে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, ইরান যুদ্ধের প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা তাঁর প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল আমদানি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন জ্বালানি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ভোটাররা ভোট দেওয়া শুরু করেছেন। এমন সময়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। জনমত জরিপেও ইরান যুদ্ধ, অর্থনীতি পরিচালনা এবং জ্বালানির দাম নিয়ে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কমার চিত্র উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি নিয়ে বিতর্ক

জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগ হিসেবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে চুক্তিটিকে মার্কিন নাগরিকদের জন্য কম দামে জ্বালানি নিশ্চিত করার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডিজেলের চাহিদা অনেক বেশি। কৃষিযন্ত্র চালানো থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই জ্বালানি অপরিহার্য। ফলে ডিজেলের উচ্চমূল্য কৃষক, পরিবহন খাত এবং সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই আপত্তি উঠেছে। চারজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মিলে ট্রাম্পকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

সিনেটরদের বক্তব্য, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর রুশ জ্বালানি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল কংগ্রেস। তাঁদের মতে, রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের আশঙ্কা, এই উদ্যোগের ফলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়নে পরোক্ষভাবে সহায়তা হতে পারে।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নিয়ে অনিশ্চয়তা

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার দুই দিন পর ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা জানান। তবে এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, চুক্তির বিষয়ে তাঁকে আগে থেকে জানানো হয়নি। যদিও তিনি বলেছেন, ইউক্রেন চুক্তিটি মেনে চলবে। অন্যদিকে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর মধ্যেই গত রোববার রাতে ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নতুন করে হামলার খবর সামনে আসে। সোমবার জেলেনস্কি ব্যঙ্গ করে বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পড়েন না বলেই মনে হচ্ছে। তিনি আরও সতর্ক করেন, রাশিয়া শীতকালে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনও পাল্টা জবাব দেবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানও বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো তিনি মস্কোকে, আবার কখনো কিয়েভকে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার জন্য দায়ী করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের রুশ তেল অবকাঠামোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।

এমনকি গত শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জেলেনস্কির পরিবর্তে ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও সিএনএনের প্রতিবেদনের বরাতে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, রুশ শোধনাগারে হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনের কাছে অস্ত্র বিক্রি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পও জেলেনস্কিকে হামলা বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা বাড়ছে

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার প্রতিক্রিয়া এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের উদ্যোগকে সমর্থন জানালেও রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেছেন।

কার্নির মতে, রাশিয়াকে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইউরোপে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্বাধীন থিংকট্যাংক প্যানজিয়া পলিসির প্রতিষ্ঠাতা টেরি হেইনস বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না করা ব্যক্তিদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছেন। তাঁর মতে, চূড়ান্ত সমঝোতার আগেই কোনো চুক্তি নিয়ে সাফল্যের ঘোষণা দেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল রয়েছে।

এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি ও বিভিন্ন শান্তি উদ্যোগ নিয়েও ট্রাম্প আগেভাগে সাফল্যের দাবি করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার বাস্তব অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যে ব্যবধান থাকায় এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ডিজেলের দাম কমেনি প্রত্যাশা অনুযায়ী

রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। দাম রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা নেমে এলেও প্রতি গ্যালন ছয় ডলারের ওপরে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এ পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জ্বালানির দাম সরাসরি পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন এবং নিত্যপণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। জ্বালানি ব্যয় দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়তে পারে।

নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ তাই রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বাজারে তার প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় নতুন করে বাড়ছে শঙ্কা

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের নতুন হামলা আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বিবিসিকে বলেন, হুতিদের হামলা শুধু সামরিক বা জ্বালানি অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ না থেকে বেসামরিক বিমানবন্দরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে বহু মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো আরব দেশই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ চায়নি। সাম্প্রতিক হুতি হামলাকে তিনি ওই সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব জ্বালানি সংকটের জন্য ইউক্রেনের হামলাকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বাড়ানোর বিষয়েও কথা বলেছেন। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একসঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।

নির্বাচনের আগে বড় চ্যালেঞ্জ ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি—তিনটি বিষয়ই ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি থেকে দ্রুত সুফল পাওয়ার আশা থাকলেও এখন পর্যন্ত দামে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। পাশাপাশি চুক্তিটি নিয়ে নিজ দলের সদস্যদের আপত্তিও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে জ্বালানির উচ্চমূল্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ভোটাররা সাধারণত তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয় ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাসীন প্রশাসনকেই জবাবদিহির আওতায় আনেন।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানো এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সহজ সমাধান না থাকায় আগামী দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি মার্কিন রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর থাকবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের নানা চাপ

আপডেট সময় : ১২:৫৩:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নানা চাপে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, ইরান যুদ্ধের প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা তাঁর প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল আমদানি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন জ্বালানি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ভোটাররা ভোট দেওয়া শুরু করেছেন। এমন সময়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। জনমত জরিপেও ইরান যুদ্ধ, অর্থনীতি পরিচালনা এবং জ্বালানির দাম নিয়ে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কমার চিত্র উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি নিয়ে বিতর্ক

জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগ হিসেবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে চুক্তিটিকে মার্কিন নাগরিকদের জন্য কম দামে জ্বালানি নিশ্চিত করার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডিজেলের চাহিদা অনেক বেশি। কৃষিযন্ত্র চালানো থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই জ্বালানি অপরিহার্য। ফলে ডিজেলের উচ্চমূল্য কৃষক, পরিবহন খাত এবং সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই আপত্তি উঠেছে। চারজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মিলে ট্রাম্পকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

সিনেটরদের বক্তব্য, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর রুশ জ্বালানি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল কংগ্রেস। তাঁদের মতে, রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের আশঙ্কা, এই উদ্যোগের ফলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়নে পরোক্ষভাবে সহায়তা হতে পারে।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নিয়ে অনিশ্চয়তা

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার দুই দিন পর ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা জানান। তবে এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, চুক্তির বিষয়ে তাঁকে আগে থেকে জানানো হয়নি। যদিও তিনি বলেছেন, ইউক্রেন চুক্তিটি মেনে চলবে। অন্যদিকে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর মধ্যেই গত রোববার রাতে ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নতুন করে হামলার খবর সামনে আসে। সোমবার জেলেনস্কি ব্যঙ্গ করে বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পড়েন না বলেই মনে হচ্ছে। তিনি আরও সতর্ক করেন, রাশিয়া শীতকালে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনও পাল্টা জবাব দেবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানও বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো তিনি মস্কোকে, আবার কখনো কিয়েভকে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার জন্য দায়ী করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের রুশ তেল অবকাঠামোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।

এমনকি গত শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জেলেনস্কির পরিবর্তে ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও সিএনএনের প্রতিবেদনের বরাতে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, রুশ শোধনাগারে হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনের কাছে অস্ত্র বিক্রি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পও জেলেনস্কিকে হামলা বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা বাড়ছে

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার প্রতিক্রিয়া এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের উদ্যোগকে সমর্থন জানালেও রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেছেন।

কার্নির মতে, রাশিয়াকে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইউরোপে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্বাধীন থিংকট্যাংক প্যানজিয়া পলিসির প্রতিষ্ঠাতা টেরি হেইনস বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না করা ব্যক্তিদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছেন। তাঁর মতে, চূড়ান্ত সমঝোতার আগেই কোনো চুক্তি নিয়ে সাফল্যের ঘোষণা দেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল রয়েছে।

এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি ও বিভিন্ন শান্তি উদ্যোগ নিয়েও ট্রাম্প আগেভাগে সাফল্যের দাবি করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার বাস্তব অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যে ব্যবধান থাকায় এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ডিজেলের দাম কমেনি প্রত্যাশা অনুযায়ী

রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। দাম রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা নেমে এলেও প্রতি গ্যালন ছয় ডলারের ওপরে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এ পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জ্বালানির দাম সরাসরি পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন এবং নিত্যপণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। জ্বালানি ব্যয় দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়তে পারে।

নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ তাই রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বাজারে তার প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় নতুন করে বাড়ছে শঙ্কা

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের নতুন হামলা আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বিবিসিকে বলেন, হুতিদের হামলা শুধু সামরিক বা জ্বালানি অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ না থেকে বেসামরিক বিমানবন্দরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে বহু মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো আরব দেশই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ চায়নি। সাম্প্রতিক হুতি হামলাকে তিনি ওই সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব জ্বালানি সংকটের জন্য ইউক্রেনের হামলাকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বাড়ানোর বিষয়েও কথা বলেছেন। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একসঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।

নির্বাচনের আগে বড় চ্যালেঞ্জ ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি—তিনটি বিষয়ই ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি থেকে দ্রুত সুফল পাওয়ার আশা থাকলেও এখন পর্যন্ত দামে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। পাশাপাশি চুক্তিটি নিয়ে নিজ দলের সদস্যদের আপত্তিও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে জ্বালানির উচ্চমূল্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ভোটাররা সাধারণত তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয় ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাসীন প্রশাসনকেই জবাবদিহির আওতায় আনেন।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানো এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সহজ সমাধান না থাকায় আগামী দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি মার্কিন রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর থাকবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা