ব্যাংককে নজিরবিহীন বন্যা: দুর্যোগকবলিত এলাকা ঘোষণা
- আপডেট সময় : ০৫:১৪:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৫৫ বার পড়া হয়েছে
ব্যাংকক বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুর্যোগকবলিত ঘোষণা ও জরুরি সতর্কতা ঘোষণা করা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৪৮ ঘণ্টার অবিরাম মুষলধারে বৃষ্টিপাতে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বা প্রায় ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির ফলে শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
ব্যাংককের প্রধান সড়কগুলোতে জল জমার কারণে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু নিচু এলাকায় পানি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে যানবাহনের চাকা ও অধিকাংশ অংশ জলের নিচে তলিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষকে কোমরসমান বা বুকসমান দূষিত বন্যার পানির মধ্যে দিয়েই পথ চলতে দেখা যাচ্ছে, যা তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।
খালের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত
ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ ঘোষণা করে জানিয়েছেন যে, এই আকস্মিক ও ভয়াবহ সংকট সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। বিশেষ করে ব্যাংককের বুক চিরে প্রবাহিত খালগুলোর (Khlong) আশপাশের বসতি ও এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে। জলস্তর বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ওই অঞ্চলের মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের জরুরি পদক্ষেপ
দুর্যোগ মোকাবিলায় থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র এবং ফিল্ড কিচেন বা অস্থায়ী রান্নার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। ব্যাংকক মেট্রোপলিটন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিএমএ) শহরের অসংখ্য স্কুলকে অস্থায়ী আবাসন কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগরবাসীকে বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের না হতে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট
এই আকস্মিক বন্যায় জনমনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সুপার মার্কেট ও মুদির দোকানগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। নাগরিকরা খাদ্যপণ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও জরুরি ওষুধপত্র মজুত করার জন্য ছুটছেন। ১৯ বছর বয়সী তরুণ সানসুক লাওয়াচারাকুল তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান যে, বাবা-মা পাশে না থাকায় এবং আগে থেকে পর্যাপ্ত খাবার মজুত না করার কারণে তিনি চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একইভাবে, কনডোমিনিয়ামে আটকে থাকা বাসিন্দারাও মালপত্র গুছিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। সপ্পাকার্ন জুলাভিজিতফং নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট সতর্কতা জারির আগে তিনি পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতে পারে তা অনুধাবন করতে পারেননি।
বিমান চলাচল স্বাভাবিক তবে অতিরিক্ত সময় হাতে রাখার পরামর্শ
ইতিবাচক দিক হলো, ব্যাংককের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর (Suvarnabhumi Airport)—এখনো পর্যন্ত তার স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তবে থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ বিদেশ থেকে আগত ও বহির্গামী ভ্রমণকারীদের বিমান ধরতে বা যাতায়াত করতে হলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত দুই থেকে তিন ঘণ্টা হাতে নিয়ে যাত্রা করার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ রাস্তার স্থবিরতা বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছানোর পথকে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও মেগাসিটির দুর্বল অবকাঠামো
উল্লেখ্য, এর আগে থাইল্যান্ডে নজিরবিহীন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস রয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে এর আগে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী বন্যায় অন্তত ১৪৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষের বসতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই স্মৃতির রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানী ব্যাংককে এই নতুন বিপর্যয় থাইল্যান্ডের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং মেগাসিটির নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকে আবারও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।


























