প্রতিশ্রুতির রঙিন ফানুসে কি মিলবে চট্টগ্রামের অমীমাংসিত প্রশ্নের সমাধান?
- আপডেট সময় : ০৭:০১:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৬৫৯ বার পড়া হয়েছে
সারাদেশের নজর যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে, তখন দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামে বইছে ভিন্ন এক হিসাব-নিকাশ। নির্বাচন ঘিরে সারা দেশের মানুষের মতো চট্টগ্রামবাসীর মনেও নানাবিধ প্রশ্ন ও প্রত্যাশা। প্রতিবার নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির রঙিন ফানুস ওড়ে, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়া হয় শহরের অলিগলি। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই চিরচেনা অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোই আসে চট্টগ্রামবাসীর চোখের সামনে? এবারো কি তেমন হবে? নাকি মিলবে সমাধান।
দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল হিসেবে চট্টগ্রামের গুরুত্ব কেবল মানচিত্রে কোনো সীমানা নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির মেরুদন্ড। দেশের সিংহভাগ রাজস্ব আয় আসে এই জনপদ থেকেই। অথচ নির্মম বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর ধরে এই শহর ও বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষ কিছু মৌলিক সমস্যার ভার বয়ে বেড়াচ্ছে।
এই শহরের সবচেয়ে বড় অভিশাপ জলাবদ্ধতা। চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা এখন আর কোনো মৌসুমি দুর্যোগ নয়, এটি একটি স্থায়ী নগর সংকটে রূপ নিয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই যখন শহরের প্রধান সড়ক, মানুষের শোবার ঘর আর দোকানপাট নোংরা পানিতে ডুবে যায়, তখন বাণিজ্যিক রাজধানীর তকমাটি যেন উপহাসের মতোই। বছরের পর বছর ধরে খাল দখল, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবাধে পাহাড় কাটা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অমার্জনীয় অবহেলা-সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
জলাবদ্ধতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের অস্তিত্বের প্রতীক কর্ণফুলী নদী। চট্টগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে কর্ণফুলীর সম্পর্ক মানুষের শরীরে প্রবাহিত রক্তধারার মতো। এই নদী শুধু পানি বয়ে আনে না-এটি বন্দর, বাণিজ্য, জনজীবন ও সভ্যতার ধারক। অথচ আজ সেই কর্ণফুলীই দূষণ, দখল আর অবহেলার ভারে জর্জরিত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। কর্ণফুলী বাঁচলে চট্টগ্রাম বাঁচবে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই নদী আজ দেশের অন্যতম দূষিত নদীর তালিকায় শীর্ষে। নগরীর অপরিশোধিত আবাসিক বর্জ্য, শিল্পকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক, জাহাজ ও নৌযানের তেল-সব মিলিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য এসে পড়ছে এই নদীর বুকে।
এই মুমূর্ষু নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কালুরঘাট সেতু যেন চট্টগ্রামের আরেকটি চিরদুঃখের আখ্যান। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ আমলে রেলসেতু হিসেবে তৈরি এই জরাজীর্ণ কাঠামোটি আজ দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো মানুষের একমাত্র জীবনরেখা। ভারী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আর একমুখী যান চলাচলের চাপে সেতুটি প্রতিদিন দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন কালুরঘাট সেতু কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন অবকাঠামোগত জরুরি প্রয়োজন।
চট্টগ্রামে যন্ত্রণার আরেক নাম অসহনীয় যানজট। অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা, অকার্যকর গণপরিবহন এবং বন্দরকেন্দ্রিক ভারী যানবাহনের চাপে পিষ্ট চট্টগ্রাম। এতে শুধু কর্মঘণ্টাই নষ্ট হচ্ছে না, কমছে উৎপাদনশীলতা, বাড়ছে মানসিক চাপ। যানজট নিরসন মানে শুধু রাস্তা প্রশস্ত করা বা ফ্লাইওভার নির্মাণ নয়; এটি সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন সংস্কার ও বন্দর-নগর সংযোগ পুনর্বিন্যাসের প্রশ্ন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের সংকীর্ণতা ও ঝুঁকি। দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যে যাওয়ার সড়কটি যদি মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকে, তবে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের গল্প ফাঁপা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সমস্যা চট্টগ্রাম বিভাগের ওপর এক দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর চাপ সৃষ্টি করছে। পরিকল্পিত পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং স্থানীয় অবকাঠামো সুরক্ষায় শক্ত রাজনৈতিক ভূমিকা ছাড়া এই সংকট সামাল দেয়া অসম্ভব।
চট্টগ্রামবাসী আর কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি শুনতে চায় না। চট্টগ্রামের মানুষ চায় দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত, কঠোর বাস্তবায়ন আর দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। কর্ণফুলী আর কালুরঘাট- এই দুটি প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে, চট্টগ্রামের উন্নয়ন কি সত্যিই নদীর স্রোতের মতো সামনে এগোবে, নাকি আবারও অবহেলার পলিতে আটকে যাবে



















